বিমানে বসার স্থান নির্বাচন কেবল আরামের বিষয় নয়; দীর্ঘদিনের কেবিন ক্রুরা মনে করেন, এটি যাত্রীর মানসিকতা ও দৈনন্দিন আচরণের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ২০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট সিডনি এবং তাঁর সহকর্মী লরেটা জানান, বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে যাত্রীরা যে আসনের দিকে ঝুঁকেন, তা দেখে তাঁদের স্বভাব ও প্রয়োজন সম্পর্কে বেশ নিখুঁত ধারণা পাওয়া যায়।
হাঁটার পথের পাশে অবস্থিত আইল আসন যারা বাছেন, তাঁরা সাধারণত আরামের চেয়ে কাজের সুবিধা ও চলাচলের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। সিডনি ব্যাখ্যা করেন, এই আসনগুলোতে প্রায়শই ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের দেখা মেলে, কারণ ল্যাপটপ বের করে কাজ করা এখানে সহজ। এ ধরনের যাত্রীরা নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পছন্দ করেন; অন্যের ঘুম ভাঙিয়ে বাথরুমে যাওয়ার অনুরোধ জানাতে তাঁদের চরম অস্বস্তি হয়। ফ্লাইট শেষ হওয়ার পর দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও তাঁদের মধ্যে প্রবল।
অন্যদিকে জানালার ধারের আসন পছন্দকারীরা প্রায়শই গভীর ঘুমপ্রিয় অথবা আকাশের দৃশ্য উপভোগ করতে ভালোবাসেন—কখনো কখনো দুটোই একসঙ্গে। মাথা এলিয়ে ঘুমানোর সুবিধা ছাড়াও এখানে মাঝপথে কেউ ডিঙিয়ে যাওয়ার বিরক্তি নেই। ভিড় এড়িয়ে চলা মানুষদের জন্যও এটি আদর্শ, কারণ আইলের হাঁটাচলার পথ থেকে দূরে থাকা যায়। জানালার পর্দা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও অনেকের কাছে এই আসনের বড় আকর্ষণ।
মাঝের আসনটি সাধারণত শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এর ব্যবহারেও লুকিয়ে থাকে মানুষের সম্পর্কের কৌশল। তরুণ জুটিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষ সঙ্গী কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে মাঝখানে বসে সঙ্গিনীকে জানালার আরাম দেন। আবার দীর্ঘদিনের বিবাহিত দম্পতিরা জানালা ও আইলের আসন বুক করে মাঝখানেরটি ফাঁকা রাখার চেষ্টা করেন—আশায় যে অতিরিক্ত জায়গা পাবেন। কিন্তু যদি সেখানে অন্য যাত্রী এসে বসেন, তবে অচেনা মানুষের মাঝে পড়ে পুরো যাত্রায় অস্বস্তি ভোগ করতে হয়। স্বেচ্ছায় মাঝখানের আসন বাছাই করা ব্যক্তি হয়তো সংঘাত এড়িয়ে চলেন, নয়তো অত্যন্ত সামাজিক—দুই পাশের মানুষের সঙ্গেই কথা বলার প্রবল ইচ্ছা তাঁর।
শারীরিক উচ্চতা ও জরুরি প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত এক্সিট রো বা অতিরিক্ত পা ছড়ানোর আসনগুলো। লম্বা যাত্রীরাই সাধারণত বাড়তি খরচ করে এগুলো নেন, তবে জরুরি পরিস্থিতিতে ক্রুদের সহায়তা করার মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতিও থাকতে হয়। বিমানের সামনের দিকে বসা যাত্রীরা সাধারণত গোছানো স্বভাবের; দ্রুত নামার লক্ষ্য তাঁদের। কেউ কেউ পাইলট বা ক্রুর কাছাকাছি থাকলে নিরাপত্তা বোধ করেন। পেছনের আসনগুলোতে বসা মানুষরা তুলনামূলকভাবে বেশি চিন্তামুক্ত। ছোট শিশু থাকা পরিবারগুলো প্রায়শই পেছনের দিকে বসে, যাতে বাথরুম ও গ্যালির কাছে থাকা সহজ হয়।
ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টরা শুধু আসন দেখেই থেমে থাকেন না; যাত্রীর আচরণও তাঁদের নজরে থাকে। সামনের আসনের হাতলে পা তুলে দেওয়াকে তাঁরা অত্যন্ত বিরক্তিকর ও কাণ্ডজ্ঞানহীন মনে করেন। আবার কেউ কেউ অন্যের আসন দখল করে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুমের ভান করেন—যাতে প্রকৃত মালিক লজ্জায় কিছু বলতে না পারেন। এসব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ক্রুরা আগেভাগেই বুঝতে পারেন কার কী প্রয়োজন হতে পারে। তাই পরবর্তী ভ্রমণে মনে রাখা ভালো—আসনে বসে তুমি হয়তো আকাশ দেখছ, কিন্তু তোমার স্বভাবের একটা খোলা বই ইতিমধ্যে কারও হাতে পড়ে গেছে।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট




