বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গতি ২০২৬ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছে — মোট স্থাপিত ক্ষমতা ৩ টেরাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই অর্জনকে তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, সময়টা নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও এই সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে বিশ্ব। এক দশক আগে ২০১২ সালে যখন প্রথম ১০০ গিগাওয়াট অতিক্রম হয়েছিল, তখন মনে করা হয়েছিল এটি ধীরগতির যাত্রা। এরপর ১ টেরাওয়াট পৌঁছাতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। কিন্তু দ্বিতীয় ১ টেরাওয়াট যুক্ত হতে সময় লেগেছে মাত্র ৩ বছরের কম — যা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। আর তৃতীয় টেরাওয়াটটি এসেছে আরও দ্রুত, মাত্র ২ বছরের মধ্যেই।
ব্লুমবার্গএনইএফের সৌর গবেষণা প্রধান লারা হায়িমের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে এই অগ্রগতির প্রতিফলন পরিসংখ্যানে নয়, বরং দৃশ্যমান আকারে ধরা পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যের মতো দেশে ট্রেনে যাতায়াতের সময় জানালার বাইরে তাকালেই এখন অসংখ্য ছাদে সোলার প্যানেল দেখা যায়। এই দৃশ্যমান সংকেত আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বে ৯ টেরাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হবে, তখন ৩ টেরাওয়াটের মাইলফলকটি তুচ্ছ হয়ে যাবে।
তবে এই সামগ্রিক অগ্রগতির পেছনে কিছু আকর্ষণীয় প্রবণতা রয়েছে। প্রথম টেরাওয়াট মূলত ধনী দেশগুলোর ভর্তুকির ফলে স্থাপিত হয়েছিল, কারণ তখন চীন এবং দরিদ্র দেশগুলোর কাছে সৌর প্যানেলের খরচ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু দ্বিতীয় এবং তৃতীয় টেরাওয়াটে এই চিত্র বদলে যায় — চীনই মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ফলে গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গতি বাড়লেও দরিদ্র দেশগুলোর অংশগ্রহণের হার ২০২০ সালের পর থেকে স্থবির ছিল। হায়িমের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন বৈশ্বিক এই গল্পের প্রধান নায়ক হলেও সংখ্যাগুলো ভেঙে দেখলে বোঝা যায়, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া এবং ফিলিপাইনের মতো দেশেও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ব্যাপক উৎসব চলছে। এমনকি কিউবা ও লেবাননের মতো ছোট বাজারগুলোতেও দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। ফলে ২০২০ সালে যেখানে মাত্র ৪২টি দেশে ১ গিগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ ছিল, সেখানে গত বছর তা বেড়ে ৭৪টি দেশে পৌঁছেছে।
চীনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গতি ট্রান্সমিশন লাইন এবং ব্যাটারির মতো সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে অনেক দ্রুত। এর ফলে দিনের বেলায় সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করে দিতে হচ্ছে, যা সম্পদের অপচয় বলে বিবেচিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর ফলে চীনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের গতি কিছুটা কমতে পারে। দেশটির নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উৎপাদন বাড়ানোর চেয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে — যা ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্লুমবার্গএনইএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার থেকে দরিদ্র দেশগুলোর অংশগ্রহণ আবার বাড়তে শুরু করবে। কারণ, বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অনুপ্রবেশ এখনও খুবই কম, ফলে চীন বা অন্য বড় ব্যবহারকারীদের এখন যে সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে, সেগুলো তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সৌরবিদ্যুতের এক-চতুর্থাংশের বেশি স্থাপিত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, আর ধনী দেশগুলোর অংশ ২০ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতের এই উত্থান ঘটেছে যখন দেশগুলো নানা স্থানীয় সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে — দক্ষ কর্মীর অভাব থেকে শুরু করে পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিচালনার চ্যালেঞ্জ। তবে হায়িমের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় বাধা এখনও সহজলভ্য অর্থায়নের অভাব। অন্যদিকে, গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যোগ করার একটি তাত্ত্বিক সীমাও রয়েছে। কারণ, একবার দিনের বেলা সমস্ত চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে আরও যোগ করার কোনো মূল্য থাকে না। অস্ট্রেলিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মতো উচ্চ অনুপ্রবেশকারী অঞ্চলগুলোতে দিনের বেলা নিয়মিত নেতিবাচক বিদ্যুতের দাম দেখা যায়, যা ইঙ্গিত দেয় গ্রিডে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এই সমস্যা কিছুটা সমাধান করতে পারে — দিনের বেলা অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে সন্ধ্যায় তা ব্যবহার করা যায়। অস্ট্রেলিয়ার নীতিনির্ধারকরা বাড়িতে ব্যাটারি স্থাপনে ভর্তুকি দিয়ে এই পথকে উৎসাহিত করছেন। পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও নীতিগত সহায়তা ছাড়াই এই প্রবণতা শুরু হয়েছে — সৌরবিদ্যুতের পর সেখানে ব্যাটারি বুম দেখা যাচ্ছে। হায়িমের মতে, ব্যাটারি স্টোরেজ না থাকলে সৌর বিপ্লব অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়, কারণ পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা ছাড়া সৌর শক্তির পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে না।




