নিউ ইয়র্ক সিটিতে ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে গত এক বছর ধরেই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন একাধিক বিলিয়নিয়ার। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, শহরের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কারণে মূলধন, উদ্যোগ এবং উচ্চ আয়ের কর্মীরা অন্যত্র চলে যেতে পারেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে অগ্রাহ্য করেই সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে তাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যানথ্রপিক এবং ভাড়া পরিষেবা প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করা অ্যানথ্রপিক ম্যানহাটনের ৩৩০ হাডসন স্ট্রিটে পুরো ১৬ তলা বিশিষ্ট একটি অফিস ভবন ইজারা নিচ্ছে। আগে কোম্পানিটির নিউ ইয়র্ক অফিসটি ছিল একই এলাকার ১৫৫ সিক্সথ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত ছোট এক জায়গায়। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা শহরে তাদের কর্মীর সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে। চলতি বছরের শুরুতে অ্যানথ্রপিকের নিউ ইয়র্কে পাঁচশোর কম কর্মী থাকলেও ডিসেম্বর নাগাদ সেই সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১৬ তলা ভবনটিতে ১ হাজার ৭০০ জন কর্মীর জন্য জায়গা থাকবে। বর্তমানে কোম্পানিটি নিউ ইয়র্কে গবেষণা, প্রকৌশল, নীতি, বিক্রয় এবং পরিচালনা—এই পাঁচটি বিভাগে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা পল স্মিথ এক বিবৃতিতে বলেন, নিউ ইয়র্ক শহরটি হলো সেই জায়গা যেখানে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তাদের কোম্পানি সেই কেন্দ্রে অবস্থান করছে যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এআই প্রযুক্তির কাজগুলো আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্যই নিউ ইয়র্কে তাদের দল দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে এয়ারবিএনবি নিউ ইয়র্কে তাদের সবচেয়ে বড় রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, গ্রামার্সি এলাকায় ২৮১ পার্ক অ্যাভিনিউ সাউথে ছয় তলা বিশিষ্ট একটি ভবন ৮১.৫ মিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে তারা। এই ভবনটি এয়ারবিএনবির নিউ ইয়র্ক অঞ্চলের ৬০০-এর বেশি কর্মীর জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান চেস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, নিউ ইয়র্ক তার কোম্পানির ইতিহাসের শুরুর দিক থেকেই জড়িত। এই ভবন কেনার মাধ্যমে শহরের প্রতি তাদের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে, যা সান ফ্রান্সিসকোর বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় কর্মী কেন্দ্র হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যানথ্রপিক ও এয়ারবিএনবির এই পদক্ষেপ পুরোপুরি উল্টো পথে হাঁটার মতো, যা বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী বিল অ্যাকম্যানের গত বছরের সতর্কবার্তাকে অগ্রাহ্য করছে। অ্যাকম্যান বলেছিলেন, জোড়ান মামদানি মেয়র হলে নিউ ইয়ার্ক থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য পালিয়ে যাবে। সিটাডেলের প্রতিষ্ঠাতা কেন গ্রিফিনও নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়ী নেতাদের 'তাদের শহরের জন্য লড়াইয়ে' নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। মেয়র মামদানি এবং নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল উভয়েই অ্যানথ্রপিকের সম্প্রসারণের ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়েছেন। নগর হিসাবরক্ষক মার্ক লেভিন বলেছেন, এই প্রযুক্তি যেহেতু নিউ ইয়র্কেই তৈরি হবে, তাই অর্থনৈতিক সঞ্চালন থেকে শহরবাসী উপকৃত হবেন এবং প্রতিদিন সাবওয়েতে চলাচলকারী বৈচিত্র্যময় নিউ ইয়র্কবাসীরাই এই সরঞ্জামগুলো গঠন করবেন।
অ্যানথ্রপিকের জন্য নিউ ইয়ার্ক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহরটি অর্থ, গণমাধ্যম, আইনি পরামর্শ, পরামর্শক, বিজ্ঞাপন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো সেসব শিল্পের কাছাকাছি অবস্থান করছে যারা দ্রুত জেনারেটিভ এআই গ্রহণে এগিয়ে যাচ্ছে। গত নভেম্বরে কোম্পানিটি আমেরিকায় এআই কম্পিউটিং অবকাঠামোতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল, যার মধ্যে নিউ ইয়র্কে ডেটা সেন্টার নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, এয়ারবিএনবির জন্য নিউ ইয়র্কে এই সম্প্রসারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোম্পানিটি শহরের সাথে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে ছিল। ২০২২ সালে গৃহীত স্থানীয় আইন ১৮-এর মতো স্বল্পমেয়াদী ভাড়া বিধিনিষেধের ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভ্রমণ বাজারে কোম্পানিটির মূল ব্যবসা সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবুও ম্যানহাটনে নিজস্ব ভবন কিনে স্থায়ী ঠিকানা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি সংবেদনশীল সময়। অগ্রগামী নগর নীতি, ধনীদের ওপর কর প্রস্তাব, আবাসনের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে সংগ্রাম এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কোম্পানিগুলোকে কর-সুবিধাযুক্ত রাজ্যে স্থানান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস ও স্টারবাক্সের সাবেক প্রধান নির্বাহী হাওয়ার্ড শুল্টজের মতো উচ্চ-প্রোফাইল ব্যক্তিরা করমুক্ত ফ্লোরিডায় পাড়ি দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে অ্যানথ্রপিক ও এয়ারবিএনবির নিউ ইয়র্কমুখী সম্প্রসারণ নগরীর অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফরচুন ডটকমের প্রতিবেদন অবলম্বনে রচিত।




