জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবার নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পথে সংগঠনটি। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকা ইতিমধ্যে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর যেকোনো সময় কমিটি ঘোষণা করা হবে। বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার রাতে সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনসহ শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকটিকে বিদায়ী নেতৃত্বের সাক্ষাৎ হিসেবে দেখা হচ্ছে, পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব নিয়েও মতামত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সম্ভাব্য সব প্রার্থীকেই তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। ফলে অতীতে বিএনপির কিছু নেতার সমন্বয়ে গঠিত 'সিন্ডিকেট' নামক গোষ্ঠী যেভাবে কমিটি গঠনে প্রভাব বিস্তার করত, এবার সে সুযোগ থাকছে না।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এবারের কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। ১৭ বছর পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নেতা-কর্মীদের মাঝে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশ অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন। সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, ফলে যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই। এতে করে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন কমিটির শীর্ষ পদ নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমপক্ষে ১৫ জন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মনজুরুল আলম (রিয়াদ), সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম (জিসান), ইব্রাহিম খলিল ও রাজু আহমেদ — এদের নাম আলোচনার শীর্ষে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার (অনিক), এ বি এম ইজাজুল কবির (রুয়েল), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন (শাওন) এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নামও শোনা যাচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম (সোহেল), এইচ এম আবু জাফর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম (তারিক), ফারুক আহমেদ, শরীফ প্রধান (শুভ) এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ (প্রিন্স) নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতার দুজন প্রথম আলোকে জানান, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে এবার আন্দোলনের ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাজীবন ও অতীত কর্মকাণ্ড আলাদাভাবে যাচাই করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, সারাদেশে যোগাযোগ এবং উপস্থাপনার দক্ষতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল — সেটিই এবারের প্রধান মানদণ্ড। বিশেষ করে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কে সংগঠনের সাথে ছিলেন, কে মামলা-গ্রেপ্তারের চাপের মধ্যেও সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কার অবদান কতটুকু — তা যাচাই করা হচ্ছে। একইসাথে দেখা হচ্ছে শিক্ষাজীবন, একাডেমিক ফলাফল, পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় এবং কোনো বিতর্ক বা অভিযোগ আছে কি না। তবে শীর্ষ দুই নেতৃত্বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা ও অবদান রাখা নেতারাই নতুন কমিটিতে এগিয়ে থাকবেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য অতীতে কারা কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে কাজ করার সক্ষমতা কার আছে — সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অতীতে ছাত্রদলের কমিটি গঠনে 'সিন্ডিকেট' বানিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ও গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। নতুন কমিটি ঘিরে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ থাকলেও কোনো সাবেক নেতা, আঞ্চলিক হিসাব বা 'সিন্ডিকেটের' নাম প্রকাশ্যে আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, সম্ভাব্য নেতাদের বিষয়ে তারেক রহমান নিজেই যাচাই-বাছাই করছেন এবং কেউ যাতে পরিচয় গোপন করে শীর্ষ নেতৃত্বে যেতে না পারেন সেটিও দেখা হচ্ছে। সংগঠনের সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ও পরীক্ষিত নেতাদেরই নেতৃত্বে আনা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে রুহুল কবির রিজভী সভাপতি এবং এম ইলিয়াস আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ২৭ বছর পর ২০১৯ সালে আবারও সরাসরি ভোট হয়, যাতে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তবে এবার কাউন্সিল বা সরাসরি ভোটের কোনো প্রস্তুতি নেই বলেই জানা যাচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছর মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হলেও প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই দায়িত্ব পালন করছে।
দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাই কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য বিজয় একাত্তর হল শাখার আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী (মায়েদ), কবি জসীমউদ্দীন হল শাখার আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী (হামিম), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান (বিজয়), বি এম কাউসার, মো. আল আমীন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু হায়াৎ মো. জুলফিকার জিসান, প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান এবং আপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুল ইসলামের নাম আলোচনায় রয়েছে।




