জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রাক্কালে সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতা—যাঁরা ‘সুপার ফাইভ’ হিসেবে পরিচিত—উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাতের পর রাতে ও শুক্রবার সকালে যথাক্রমে সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট দেন, যেখানে নিজেদের দায়িত্বকাল ও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ১ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় আড়াই বছর ধরে এই কমিটি কাজ করেছে। রাকিবুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেছেন যে, মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় অত্যন্ত সম্মানজনক পরিবেশে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বিএনপির সদ্যবিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সহযোগিতা করা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ ও সহযোগীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।

নিজেদের দায়িত্ব পালনের সময়কালকে গৌরবের বলে উল্লেখ করে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ইউনিটের নেতাদের নিয়ে তিনি গর্ববোধ করেন। কারণ তাঁর নেতৃত্বাধীন কোনো নেতার নামে অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ শিরোনাম হয়নি। তীব্র আর্থিক সংকটের মাঝেও ইউনিটগুলোতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতির বিকাশে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছেন। সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দ্বারা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। এমনকি নিজ দলের বাইরের শিক্ষার্থীরাও যেকোনো সমস্যায় তাঁর কাছে এলে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেছেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে এই কমিটির প্রধান সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন রাকিবুল। তিনি উল্লেখ করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন ও রাজপথে কার্যকর ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শত শত উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ হামলার মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বুলিংয়ের শিকার হয়েও নেতৃত্ব দিতে হয়েছে বলে তিনি স্মৃতিচারণ করেন। পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, একটি নতুন জীবন শুরু করতে চান—যেখানে নিজেকে আরও পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সময় তাঁরও ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে বলে উল্লেখ করে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পাশাপাশি ছাত্রদলের আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে—এই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।

অপরদিকে, শুক্রবার সকালে ফেসবুকে পোস্ট দেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। তিনি লেখেন, আজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের এই মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ছে অসংখ্য স্মৃতি—সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।

নাছির উদ্দীন তাঁর পোস্টে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসকে সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে বর্ণনা করেন। সেই উত্তাল সময়ে নেতা-কর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাঁদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ওই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতা-কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও আবদুল কাদেরের সঙ্গে কাজ করার কথাও স্মরণ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময়ে তাঁরা ছাত্রদলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। যদিও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়তো ছাত্রদলের অবদান সব সময় সমানভাবে স্বীকৃত হয়নি, তবু সংকটের সময়ে একসঙ্গে কাজ করা সহযোগিতার মূল্য ইতিহাসে অপরিসীম—এই মন্তব্য করেন নাছির।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি লেখেন, উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণের সংস্কৃতি ছিল সেই সময়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চারদিকে নানা প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের মাঝেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। সব অপপ্রচার কাটিয়ে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত একটি বড় পরীক্ষা। তিনি আরও জানান, তাঁদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে, যা কোনো একজনের নয় বরং সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।

পোস্টের শেষাংশে নাছির উদ্দীন বলেন, আজ একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন; কিন্তু সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে বা অন্য কোনো সময়ে দেখা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে প্রাণের সংগঠন ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হোক—এই কামনা জানিয়ে তিনি প্রতিটি সহযোদ্ধার সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করেন। রাকিবুল ইসলামও তাঁর পোস্টে নতুন কমিটির প্রতি একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন, যেন সবাই তা সাদরে গ্রহণ করে।