রাজধানীর খাবারপ্রেমীদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে এলো বনানীর হোটেল সারিনা। পরিচিত বিরিয়ানি, কাবাব বা মুঘলাই পদের বাইরে পাকিস্তানের পেশোয়ার অঞ্চলের রন্ধনশৈলীর স্বাদ উপস্থাপন করতে শুরু হয়েছে ‘পেশোয়ারি ফুড ফেস্টিভ্যাল’। আগামী ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত হোটেলের লেভেল ২-এর সামারফিল্ডস রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন এই আয়োজন চলবে। পাকিস্তান থেকে আগত শেফ রাই আব্বাসের তত্ত্বাবধানে তৈরি হচ্ছে পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখোয়ার নানা পদ। উদ্বোধনী দিনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার, সঙ্গে ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথি, লাইফস্টাইল সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা।

শুধু মেনু নয়, খাবারের সঙ্গে পেশোয়ারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই আয়োজনে। হোটেলের প্রবেশপথ থেকে রেস্তোরাঁর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা—সবকিছুতে রয়েছে খাইবার পাসের ঐতিহাসিক আবহ। মূল ফটকে বাব-ই-খাইবারের প্রতিকৃতি, সঙ্গে ময়ূর, ফুল, মুঘল নকশা, জালি কারুকাজ, সাইপ্রেস গাছ ও চুকার পাখির মোটিফ স্থানীয় শিল্প-ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তুলেছে। মুঘল ও পারস্য-অনুপ্রাণিত এই নকশা পুরো স্থানটিকে একটি ভিজ্যুয়াল জার্নিতে রূপ দিয়েছে, যেন খাবারের পাশাপাশি পেশোয়ারের সংস্কৃতির এক টুকরো দেখা মেলে।

পেশোয়ারি রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মসলার ঝাঁজ নয়, বরং উপকরণের নিজস্ব স্বাদকে প্রাধান্য দেওয়া। খাইবার পাখতুনখোয়ার অনেক রেসিপিতে ধীর আঁচে রান্না, ঘি ও সীমিত সুগন্ধি মসলার ব্যবহারে মাংসের আসল স্বাদ বজায় রাখা হয়। মুঘলাই বা দক্ষিণ এশিয়ার জটিল মসলা ও গ্রেভির বদলে এই রান্না তুলনামূলক সরল, কিন্তু সেই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীরতা। উৎসবের বেশ কয়েকটি পদে এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।

উৎসবের সবচেয়ে স্মরণীয় পদগুলোর একটি মাটন রোশ। মাংস, আলু ও টমেটো দিয়ে অল্প মসলায় তৈরি এই পদে মাটনের স্বাদই মুখ্য। পরিচিত ঝোলের মতো মসলার ভার নেই; বরং টমেটোর হালকা টকভাব আর ধীরে রান্না করা মাংসের কোমলতা পদটিকে দিয়েছে আরামদায়ক এক গভীরতা। বিফ উইথ চিক পিস পোলাওতেও মসলা পরিমিত, তবে ঘির হালকা সুবাস স্পষ্ট। গরুর মাংস, চাল ও ছোলার স্বাদ একসাথে মিশে গেলেও কোনো উপাদান অন্যটিকে ছাপিয়ে যায়নি, বরং প্রতিটি কামড়ে আলাদা করে উপকরণের স্বাদ পাওয়া গেছে।

লাইভ স্টেশনে চলছিল নানা ধরনের কাবাব তৈরির ধুম, সঙ্গে ছিল পাতলা ও নরম রুমালি রুটি। গরম রুটি আর সদ্য তৈরি কাবাবের সংমিশ্রণ ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তালিকায় ছিল চিকেন শামি কাবাব, ফিশ কাবাব, আলুর কাবাব, চাপলি কাবাব, ফিশ কোফতা ও ভেজিটেবল গোলা কাবাব। এগুলোর মধ্যে চাপলি কাবাব বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—বাইরে হালকা ক্রিসপি, ভেতরে নরম এবং মসলার ভারসাম্যও ছিল চমৎকার। ফিশ কাবাব ও ফিশ কোফতাতেও মাছের নিজস্ব স্বাদ অটুট ছিল। মাংসের পদগুলোর মাঝে ভেজিটেবল গোলা কাবাব এনেছে হালকা ও সতেজ এক ভিন্নতা।

সব পদ অবশ্য সমানভাবে মন কাড়েনি। ডাল মাশ মোটামুটি মানের হলেও চানা মসলা ছিল বেশ উপভোগ্য—ঘনত্ব, মসলার ভারসাম্য ও ছোলার স্বাদের সমন্বয়ে গভীরতা তৈরি হয়েছিল। মটর কিমাও ছিল দারুণ; মাংস ও মটরের মিশেলে মসলাদার হলেও স্বাদে ছিল পর্যাপ্ত ভারসাম্য। চিকেন মহারানী পদটি মধ্য এশিয়া ও পারস্যের রান্নার প্রভাব এবং ভারতীয় মসলার মেলবন্ধনের গল্প বহন করে। দই, কাজুবাদাম, ক্রিম ও সুগন্ধি মসলায় তৈরি ক্রিমি টেক্সচারের এই পদে পাওয়া গেছে একটু রাজকীয় স্বাদ।

বিরিয়ানি মানেই বাঙালির আবেগ, আর তাই এই উৎসবের চিকেন লাহোরি বিরিয়ানি অনেকেরই নজর কাড়বে। পুরান ঢাকার পরিচিত বিরিয়ানির চেয়ে এর চরিত্র ভিন্ন—চাল, মুরগি ও মসলার সঙ্গে শুকনো ফলের ব্যবহারে এসেছে ভিন্ন সুবাস। ভারী খাবারের পাশে সালাদও ছিল ব্যতিক্রমী। তন্দুরি চিকেন সালাদ, চানা চাট ও ভেজিটেবল ইয়োগার্ট সালাদ খাবারের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। বিশেষ করে চানা চাটে টক, ঝাল ও মসলার সংমিশ্রণ ছিল বেশ উপভোগ্য।

মিষ্টির টেবিলে ছিল লাব-এ-শিরিন, শির খুরমা, জর্দা, ফিরনি, গুলাব জামুন ও শাহী টুকরা। দুধ, ঘি ও শুকনো ফলের তৈরি এসব মিষ্টি পাকিস্তানি খাবারের আরেকটি পরিচিত দিক তুলে ধরে। মসলাদার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের পর এই মিষ্টতা শেষ পাতে অন্যরকম পূর্ণতা দেয়।

পাকিস্তানি খাবার মানেই ভারী মসলা ও বিরিয়ানি—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে পেশোয়ারি রান্না। ভালো মানের মাংস, ধীর আঁচে রান্না, ঘির সুবাস ও সীমিত মসলা—এই কয়টি উপাদানেই গভীর স্বাদের পদ তৈরি করা সম্ভব। হোটেল সারিনার এই আয়োজন শুধু খাবার নয়, বরং একটি আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতিকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরার প্রয়াস। যাঁরা পরিচিত স্বাদের বাইরে ভিন্ন কিছু খুঁজছেন, তাঁদের জন্য পেশোয়ারি খাবারের এই যাত্রা উপভোগ্য হতে পারে। জনপ্রতি বুফে ডিনারের মূল্য ৭,০০০ টাকা নেট, তবে নির্বাচিত ব্যাংক কার্ডে রয়েছে ‘বাই ওয়ান, গেট টু ফ্রি’ সুবিধা।