বর্তমানে অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, অল্প বয়সীদের মধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের হার বাড়ছে এবং ব্যক্তিগতকৃত অন্ত্র মাইক্রোবায়োম চিকিৎসা আরও সাধারণ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গাঁজানো খাবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের খাদ্য নির্দেশনায় আমেরিকানদের আরও বেশি গাঁজানো খাবার গ্রহণের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের 'মেক আমেরিকা হেলদি অ্যাগেইন' আন্দোলনের অনুসারীরাও এই খাবারগুলোর প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই আন্দোলনের পক্ষ থেকে কাঁচা দুধ ও বীজ তেল নিয়ে যে অপ্রমাণিত দাবি করা হচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু গাঁজানো খাবারের উপকারিতার পেছনে কিছু বিজ্ঞান এবং হাজার হাজার বছরের মানব ইতিহাস রয়েছে।
গাঁজানো খাবারের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ফ্রিজের অভাবে খাবার সংরক্ষণের প্রয়োজন থেকে এই পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে গাঁজানো খাবারের ঐতিহ্য বিদ্যমান: দই, কিমচি, স্যুরক্রাট, দক্ষিণ ভারতের ইডলি ও দোসা। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকরা মনে করেন, এগুলো প্রায় সবার খাদ্যতালিকায় একটি চমৎকার সংযোজন হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে নতুন এবং ব্যাপক উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট খাদ্যকে সংরক্ষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাবারগুলো নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও তাদের অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাঙ্গোন হেলথের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. লিসা গাঞ্জু বলেছেন, 'আমরা বহুদিন ধরে এগুলো খেয়ে আসছি এবং সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি এটি আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।' তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে গাঁজানো বলেই সবকিছু স্বাস্থ্যকর নয়। বিয়ার ও ওয়াইনও গাঁজানো খাবার, কিন্তু এগুলো প্রোবায়োটিক নয় বরং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গাঁজানো খাবার অন্ত্রের যত্ন নেয় মূলত দুইভাবে। প্রথমত, এতে থাকা অণুজীব খাদ্যকে আগেই ভেঙে দেয়, যা হজমে সহায়তা করে এবং খাদ্যে উপলব্ধ যৌগগুলো পরিবর্তন করে। দ্বিতীয়ত, ব্যাকটেরিয়াগুলো অন্ত্রে উপস্থিত অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভারসাম্য বজায় রাখে, যার মধ্যে কিছু কম উপকারীও হতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ডায়েটিশিয়ান ডালিয়া পেরেলম্যান বলেছেন, 'কী কারণে গাঁজানো খাবার এত স্বাস্থ্যকর, আমরা এখনও তা নিয়ে কাজ করছি।' দইয়ের মতো কিছু গাঁজানো খাবার সরাসরি লাইভ প্রোবায়োটিক সরবরাহ করে। তবে টক রুটির মতো কিছু খাবার বেকিং বা অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণের সময় অণুজীব মারা যাওয়ায় এতে প্রোবায়োটিক থাকে না। তবে পেরেলম্যানের মতে, জীবাণু না থাকলেও কিছু গাঁজানো খাবার উপকারী হতে পারে বলে প্রমাণ রয়েছে।
বিপণনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সোডা, চকলেট বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার যেগুলো নিজেদের প্রোবায়োটিক বলে দাবি করে, সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। এমনকি প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্টও মূলত প্রাকৃতিক গাঁজানো খাবারে পাওয়া উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংমিশ্রণ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। পেরেলম্যান বলেছেন, 'ভোক্তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন এবং গাঁজানো ও 'অন্ত্র-স্বাস্থ্যকর' পণ্য বেছে নিচ্ছেন, কিন্তু এই ধারণাটির কোনো ক্লিনিকাল সংজ্ঞা নেই। আর বাজারজাতকরণ এই ট্রেন্ডকে কাজে লাগাচ্ছে।' ডা. গাঞ্জু চিনিযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ অতিরিক্ত চিনি গাঁজানো খাবারের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তে নেতিবাচক ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্ট করে। তিনি প্লেইন, কালচারযুক্ত গাঁজানো দুধকে সেরা দই হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, 'এটিকে তার কাজ করতে দিন।'
গাঁজানো খাবার কি ঝুঁকিপূর্ণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, গাঁজানো খাবারের বিভাগটি বিস্তৃত হলেও এগুলো সাধারণত বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ। শুধু স্বাস্থ্যগত কারণেই নয়, বরং এগুলো পাতে বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় স্বাদ যোগ করে। পেরেলম্যান বলেছেন, দুর্বল ইমিউন সিস্টেম বা ইরিটেবল বাওয়েল ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু লোকের গাঁজানো খাবার শুরু করার সময় ফোলাভাব, গ্যাস এবং অন্যান্য অস্বস্তি হতে পারে, বিশেষ করে যখন তাদের অন্ত্র মানিয়ে নিচ্ছে। ডা. গাঞ্জু বলেছেন, 'ভালো লাগলে খেতে থাকুন, খারাপ লাগলে বন্ধ করুন। একই খাবার ভিন্ন মানুষের ওপর ভিন্ন প্রভাব ফেলে।'
তাহলে কোন গাঁজানো খাবার সবচেয়ে ভালো? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিকভাবে স্যুরক্রাটকে কিমচির চেয়ে ভালো বা দইকে সেরা বলে কোনো র্যাঙ্কিং খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং বিভিন্ন ধরনের গাঁজানো খাবার নিয়মিত খাওয়াই সর্বোত্তম পদ্ধতি। ডা. গাঞ্জু ক্যাটাগরিতে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন: দুধ-ভিত্তিক (দই, কেফির) এবং ফাইবার-ভিত্তিক (কিমচি, স্যুরক্রাট)। গবেষকরা এখনও খতিয়ে দেখছেন যে কতটা পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। পেরেলম্যান প্রতিদিন দুই সার্ভিং খাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি, সামগ্রিক খাদ্যতালিকায় ফাইবারযুক্ত প্রিবায়োটিক থাকা জরুরি, যা প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্ট করে। ওলেন্ডজকি বলেছেন, 'ধীরে ধীরে শুরু করুন এবং প্রচুর পানি পান করুন। পুরো খাদ্যতালিকাই গুরুত্বপূর্ণ, শুধু একটি জিনিস নয়।'




