চীনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা টাইফুন মায়সাক ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। গুয়াংসি প্রদেশে নজিরবিহীন বন্যা এবং হুবেই প্রদেশে বিরল টর্নেডোর ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহতের সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৯০ হাজারের কাছাকাছি বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার রাত থেকে গুয়াংসির রেনহে গ্রামে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। স্থানীয়রা প্রথমে এটিকে স্বাভাবিক বর্ষণ বলেই মনে করেছিল। কিন্তু রোববার সকাল নাগাদ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পানির উচ্চতা হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছায় এবং দুপুরের মধ্যেই বাড়ির নিচতলা সম্পূর্ণ ডুবে যায়। গ্রামের বাসিন্দা ঝু বিবিসিকে জানান, 'বন্যা এত দ্রুত এসেছিল যে পালানোর সময় খাবার পর্যন্ত নিতে পারেনি কেউ।' গ্রামবাসীরা এখন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু তাদের কাছে খাবারের সংস্থান ফুরিয়ে আসছে। সাহায্যকারী দল সংখ্যায় কম হওয়ায় অনেকেই এখনও উদ্ধার হয়নি।

প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের শহর নানিং ও তার আশপাশের অঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। ঘরের ছাদে আশ্রয় নেওয়া মানুষজন উদ্ধারের জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। ৬৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তির কথায়, 'জীবনে এত বড় বন্যা দেখিনি। পানি এত দ্রুত বেড়েছে যে কিছু করার আগেই চারদিক ঘিরে ফেলেছে।' উদ্ধারকর্মীরা লাইফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে ইনফ্লেটেবল বোট নিয়ে কাজ করছেন, তবে তাদের সংখ্যা ও সরঞ্জাম অপ্রতুল বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউনবিয়াও শহরের বাসিন্দা হুয়াং বলেন, 'মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আমাদের গ্রাম ডুবে গিয়েছিল। উদ্ধারকারীদের লাইফবোটগুলো ছোট ছিল, অনেক দূর যেতে পারেনি।'

হুবেই প্রদেশে টাইফুনের প্রভাবে অন্তত দুটি টর্নেডো সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ থেকে টাইফুন মায়সাকের আনা উষ্ণ বাতাস আর উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংঘর্ষেই এই বিরল টর্নেডোর জন্ম। ২০২১ সালের পর এই অঞ্চলে এটাই প্রথম টর্নেডো। এঝো ও হুয়াংগাং শহরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। একটি রেস্তোরাঁয় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, টেবিল-চেয়ার উড়ে যাচ্ছে এবং বিদ্যুতের তার থেকে স্পার্ক ছিটকে পড়ছে। হুয়াংগাংয়ে এক ব্যক্তি তার উচ্চ ভবনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বাতাসে 'টেনে বেরিয়ে' ১২ তলা নিচে পড়ে গেছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। তিনি এখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।

বন্যার পানিতে সাপের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা। শুধু বন্য সাপই নয়, আশপাশের সাপের খামার থেকেও অনেকে পালিয়ে এসেছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। চীনে কিছু প্রজাতির সাপ ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও মাংসের জন্য চাষ করা হয়। ইউনবিয়াও গ্রামের ওয়েচ্যাট গ্রুপে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে কর্দমাক্ত মেঝেতে একটি বড় কালো সাপকে দেখে আতঙ্কিত গ্রামবাসীদের দেখা যাচ্ছে।

এদিকে, শক্তিশালী আরেকটি ঝড় সুপার টাইফুন বাভি প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় চীনের পূর্ব উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সপ্তাহের শেষের দিকে এটি আঘাত হানতে পারে। নানিংয়ের কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছে যে অতি ভারী বৃষ্টিপাত উদ্ধার কাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং 'পূর্ণোদ্যোগে' উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ প্রতিরোধ ও ত্রাণ কাজ কার্যকরভাবে সম্পাদনের ওপর জোর দিয়েছেন। তবে অনেক এলাকায় ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারের সদস্যদের খোঁজ পাচ্ছেন না অনেকে। গানতাং শহরের এক যুবতী বিবিসিকে জানান, 'গত ২৪ ঘণ্টায় বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ পাইনি। শেষ খবর ছিল তারা তৃতীয় তলায় আশ্রয় নিয়েছেন, কিন্তু পানি দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে গেছে। এখন শুধু helpless ভাবে চিন্তা করছি। কিছুই করার নেই।'

বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন। চীনের অর্থনীতি, বিশেষ করে ট্রিলিয়ন ডলারের কৃষিখাত, এই দুর্যোগে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।