রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির মধ্যে মেলে স্রষ্টা, আত্মানুসন্ধান, মানবপ্রেম, দ্রোহ ও সভ্যতার বিচিত্র নির্যাস। তাঁর অনন্তলোকযাত্রার তিথি স্মরণে শ্রদ্ধা জানানোর এই আয়োজন। আলোচনায় উঠে এসেছে সনজীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের রবীন্দ্রগান চর্চার নানা দিক।
আজিমপুরের সরকারি কোয়ার্টার্সে ওয়াহিদুল ও সনজীদার সংসার। সকাল শুরু হতো স্টেরিওগ্রামে রাগ-রাগিণীর মাধ্যমে। তারপর ওয়াহিদুলের হারমোনিয়ামে সুরসাধনা। সাংবাদিক ওয়াহিদুলের সুরের প্রথাসিদ্ধ পাঠ ছিল না, কিন্তু তিনি নবীন যুগল হিসেবে রবীন্দ্রসাগরে ডুব দেন। তাঁদের গভীর প্রেম ছিল সংগীতে। সনজীদা কৈশোরোত্তীর্ণ হয়েই তৈরি হয়েছিলেন, ওয়াহিদুলের গৃহপ্রবেশ রবীন্দ্রসুধায়।
সনজীদা কলেজশিক্ষক। ঘরে ফিরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। সংসার ও সন্তানদের ফাঁকেও গানের চর্চা করতেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাঁদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় ছায়ানট নিয়ে। দুজনের লক্ষ্য ছিল বাঙালিকে নিজ সংস্কৃতি নিয়ে চলার সাহস জোগানো। সনজীদার কাজ ছিল গান, গানের মানুষ তৈরি ও অনুষ্ঠান আয়োজন। অল্প দিনেই তাঁরা বুঝতে পারেন, সংগীতই সবচেয়ে বড় শক্তি।
ওয়াহিদুল উচ্চাঙ্গ ঘরানায় রবীন্দ্রগানে রাগরূপ খুঁজে বেড়াতেন। তিনি বাণীর চেয়ে সুরকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তবে বাণী নিয়েও তাঁর বাছবিচার ছিল। সনজীদা গানের কাব্য ফুটিয়ে তুলতেন স্পর্শ, মিড় ও বাণীর সঙ্গে সুরের খেলায়। তাঁর সামষ্টিক বোধের সূচনা অন্তত সাত দশকের। তিনি সোহরাব হোসেনের কাছে নজরুলগীতি, মুন্সী রইসউদ্দিনের কাছে রাগসংগীত এবং আলী আহসানের ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রসাহিত্যে ঝুঁকে পড়েন। হুসনা বানু খানমের কাছে পান বিশ্বকবির সুরসন্ধান।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গান নিয়ে উজ্জীবনের লড়াইয়ে প্রেরণা ছিলেন দুই মহাপুরুষ—রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষণকাজে রবীন্দ্রসাহিত্যই ছিল সনজীদার প্রধান উপজীব্য। স্বাধীন দেশে ছায়ানট ও সম্মিলন পরিষদের হাত ধরে সংস্কৃতিকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। অতিমারী করোনার সময়েও অনলাইনে রবীন্দ্রবাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন।
দুজনের গায়নে প্রধান অমিল দুটি বিষয়ে। ওয়াহিদুল স্টাকাটো নোট ব্যবহার করতেন, যেখানে সনজীদা সরাসরি যেতে চাইতেন না। অন্যদিকে, দম নেওয়ার ব্যাপারেও ভিন্নতা ছিল। সনজীদা বাণীর অর্থ ফুটাতে দমের ফুরসত খুঁজতেন। তিনি মনে করতেন, গানের প্রতি বাক্যের মধ্যেও বাক্যাংশ চিনে নিতে হয়। তবে গান গাওয়ায় মিলই বেশি। দুজনে স্বরবিতান মান্য করেছেন, মর্জিমাফিক পাল্টে ফেলেননি।
সনজীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক একই সঙ্গে গুরু ও শিল্পসৃষ্টির নিরুপম কারিগর। তাঁরা রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে বাঙালির সংস্কৃতি-মনন সৃষ্টিতে অপ্রতিম।



