রূপালি পর্দায় সিনেমা চলার সময় রাগে পর্দায় জুতা নিক্ষেপ—এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হয়েছিলেন গুণী অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। খল চরিত্রে তার নিপুণ অভিনয় দর্শকদের মনে এমনই দাগ কেটেছিল যে, ব্যক্তিগত জীবনে দেখা হলে অনেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন, বলতেন ‘আপনি ভালো মানুষ না’, ‘সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করেন’। এই সব স্মৃতিই যেন নতুন করে উস্কে দিয়েছে গত সপ্তাহে শিল্পকলা একাডেমিতে ‘দেলুপি’ সিনেমার উন্মুক্ত প্রদর্শনী। সিনেমাটি শেষ হতেই করতালির মাঝে কলাকুশলীদের মঞ্চে ডাকা হলে, জাকির চেয়ারম্যান চরিত্রের অভিনেতার হাতে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিতেই দর্শক সারি থেকে চিৎকার করে উঠেন একজন, ‘আপনি একটা ভণ্ড চেয়ারম্যান।’ অপর একজন বলেন, ‘ফ্রড’। সঙ্গে সঙ্গে পুরো হলজুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়। নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করা ওই শিল্পী ভক্তদের উদ্দেশে জানান, তিনি কেবল একটি চরিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস করেছেন এবং এটাই তার পছন্দের চরিত্র। ‘দেলুপি’র কলাকুশলীরা পর্দার চরিত্রকে এমনভাবে ধারণ করেছিলেন যে, নায়িকা নূপুরের অনুপস্থিতিও দর্শকদের কণ্ঠে তার নামের দাবি ধ্বনিত হয়। পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম জানান, নূপুর খুলনায় থাকায় এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তিনি যে ছোট ছোট চরিত্রকে প্রাণবন্ত করে তোলায় দক্ষ, তা ‘দেলুপি’ সিনেমায় প্রমাণিত হয়েছে।

তবে বাংলা সিনেমায় একটি চরিত্র নিখুঁতভাবে তৈরি করার এই জায়গাতেই বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে, যে সব পার্শ্বচরিত্র কিংবা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় অভিনেতারা প্রশংসিত হন, তারা সময়ের সাথে কেন হারিয়ে যান? মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘শাটিকাপ’-এ প্রশংসা পাওয়া আহসাবুল ইয়ামিন, অমিত রুদ্র, নাজমুস সাকিবের মতো তরুণদের পরবর্তী সময়ে মূলধারায় তেমন ডাক পড়েনি। অতীতের দিকে তাকালে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’র কেন্দ্রীয় চরিত্রের ফজলুল হক পরবর্তী সময়ে তেমন সুযোগ পাননি। ‘অনিল বাগচীর একদিন’র আরেফ সৈয়দ অভিনয় ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, টিকে থাকতে না পারার হতাশা প্রকাশ করে। হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র মামুন বর্তমানে ব্যবসা করছেন। একই চিত্র ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র লিয়ন, ‘প্রিয় মালতি’র শাহজাহান সম্রাট অথবা ‘এশা মার্ডার’র ইজাজ আহমেদের মতো অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও। ‘শোভনের স্বাধীনতা’য় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা রুদ্র রাইয়ান প্রথম আলোকে জানান, সিনেমায় প্রশংসিত হওয়ার পরেও ধরনা দিয়েও কাজ পাননি, ফলে এখন চাকরি নিয়ে থাকছেন এবং অভিনয়ের ইচ্ছা হারিয়ে ফেলছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক তরুণ অভিনেতা জানান, চাকরি ছেড়ে অভিনয় শুরু করেও তিনি হতাশ, আগামী মাসের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চিত।

নির্মাতাদের সঙ্গেও এ প্রসঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিচিতির অভাব, শিল্পীর যোগাযোগের নম্বর না পাওয়া কিংবা পূর্বনির্ধারিত কাস্টিং—এসবই বড় বাধা। নাট্য নির্দেশক রাফাত মজুমদার উল্লেখ করেন, তিনি আদনান আল রাজীবের কাজ দেখে শরীফ সিরাজকে কাস্টিং করেছিলেন এবং পরে কাজও হয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, অনেক শিল্পী সিনেমা বা ওটিটি থেকে নাটকে আসতে চান না। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছোট চরিত্র বা ইন্ডি সিনেমা থেকেই বড় তারকা হয়ে ওঠার অসংখ্য নজির রয়েছে। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও থেকে শুরু করে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী বা ভিকি কৌশল—তাঁরা সংগ্রাম করে উপরে উঠেছেন। নওয়াজউদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’-এ পকেটমার, ভিক্ষুক, দারোয়ানের মতো অসংখ্য ছোট ছোট চরিত্রে কাজ করে গেছেন এবং নিজেকে সেই আকৃক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।

বাংলাদেশের তরুণ অভিনয়শিল্পীদের নিয়মিত মূলধারায় কাজ পেতে কী করতে হবে, এ বিষয়ে পরিচালক শিহাব শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন শিল্পী যখন কোনো চরিত্রে প্রশংসিত হন, তখন তাকে অবশ্যই সেই একই ধাঁচের চরিত্রের বাইরে এসে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দক্ষতা অর্জনের চর্চা করতে হবে। দেখা যায়, কেউ খুনি চরিত্রে দারুণ করলেও রোমান্টিক ভূমিকায় সফল হন না। সব ধরণের কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে, কোনো সীমাবদ্ধতা থাকা চলবে না।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘নিজের লুক ও গ্রুমিংয়ের প্রতি যত্নশীল হতে হবে, যা অনেকেই নেন না। আত্মপ্নয় অবস্থান থেকে বের হয়ে অডিশন দেওয়া এবং নিজেকে যোগ্য করে তোলার মানসিকতা থাকতে হবে। কেবল ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না।’