কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবন শুরু হয় ১৯১৯ সালে। মাসিক সওগাতের জ্যেষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনি’ এবং একই বছরে ‘মুক্তি’ শিরোনামে প্রথম কবিতা। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক—সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই অসাধারণ অবদান রেখেছেন তিনি। গান রচনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য। নির্দিষ্ট কোনো সময় বা নিয়ম মেনে তিনি গান লিখতেন না। যে কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গান লিখে সুর দিতে পারতেন। পাঁচ মিনিটে যেমন গান লিখেছেন, তেমনি আধঘণ্টা সময় নিয়েও রচনা করেছেন। কখনো আগে সুর তৈরি করে তারপর শব্দ বসাতেন, আবার কখনো উল্টোটাও করতেন। ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত ‘নজরুলগীতি অখণ্ড’র তৃতীয় সংস্করণ (২০০৪) অনুযায়ী নজরুলের গানের সংখ্যা ২ হাজার ৫০৪। রশিদুন নবীর সম্পাদনায় নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত ‘নজরুলসঙ্গীত সমগ্র’ (২০০৬) অনুসারে তা ৩ হাজার ১৬৩। বিভিন্ন সূত্রে সংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও এটা স্পষ্ট যে তাঁর গানের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।
নজরুলের রচনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ। শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন অক্ষরে অক্ষরে, শব্দে শব্দে। সেই ধারা গানেও প্রবাহিত হয়েছে। বিশেষ করে ‘কারার ঐ লৌহ-কবাট’ গানটি প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে যুগে যুগে উচ্চারিত হয়েছে। তবে গানটি প্রথমে কবিতা হিসেবে রচিত হয়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত ১৯২১ সালে, যখন মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ব্রিটিশদের বিরোধিতা করায় অনেক সংগ্রামী কারারুদ্ধ হন। ‘বাঙ্গালার কথা’ পত্রিকার সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাশও গ্রেপ্তার হন ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর। তার স্ত্রী বাসন্তী দেবী সম্পাদকের দায়িত্ব নিলে তিনি সুকুমাররঞ্জন দাশকে নজরুলের কাছে পাঠান একটি কবিতার জন্য। কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ বইয়ে লিখেছেন, সুকুমাররঞ্জন কবিতা চাওয়ার পরপরই নজরুল লিখতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে লেখা শেষ করে তিনি তা পড়ে শোনান। এই কবিতাটি ছিল ‘ভাঙার গান’। নজরুলের স্বভাব ছিল যে কোনো কবিতা ছাপার আগে নিজ হাতে পরিষ্কার কপি তৈরি করা। সেই নিয়মেই তিনি কাজ করেন। বইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বরের পর এবং ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারির আগে কোনো এক দিন কবিতাটি রচিত হয়। এটি ‘বাঙ্গালার কথা’য় ছাপা হয় ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারি। পরে ১৯২৪ সালে ‘ভাঙার গান’ শিরোনামের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ করেছিল।
কবিতাটি কীভাবে গানে পরিণত হলো? শোনা যায়, প্রকাশের পর চিত্তরঞ্জন দাশ হুগলি জেলসহ বিভিন্ন জেলে স্বদেশি আন্দোলনের বন্দীদের নিয়ে গানটি গাইতেন। স্বাধীনতার পর ১৯৪৯ সালে ‘কারার ঐ লৌহ-কবাট’ রেকর্ড করা হয় গিরীন চক্রবর্তীর কণ্ঠে। কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি থেকে ১৯৪৯ সালের জুন মাসে এটি প্রকাশিত হয়। একই বছর ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ চলচ্চিত্রে প্রথম গানটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেও গানটি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে পরিচালক জহির রায়হান গানটি ব্যবহার করেন। সেখানে জেলখানায় বন্দীদের কণ্ঠে গানটি পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠে। এখনও আলতাফ মাহমুদের সুরে ও খান আতাউর রহমানের সংগীতায়োজনে গানটি ধ্বনিত হয়।
শুধু এই গান নয়, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে নতুনকে আহ্বান জানিয়েছেন নজরুল আরও অনেক গানে। তিনি বলেছেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়’—যেখানে পুরাতনের সব দ্বিধা লীন হয়ে যায়। সমাজের অন্যায্য বন্ধন ভাঙার গানেও তিনি সোচ্চার। ‘এই শিকল-পরা ছল্ মোদের এই শিকল-পরা ছল’—এ বাণী সব বাঁধন ভাঙার আহ্বান জানায়। তরুণ প্রজন্মের জন্য নজরুলের সংগ্রামী গানের অংশ বিশেষ। ‘চল্ চল্ চল্! / ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’—এ রণসংগীত তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে। ‘আমরা শক্তি আমরা বল / আমরা ছাত্রদল’—এ বাণী আন্দোলনে সত্যি হয়ে ওঠে। ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ গান তরুণদের অন্যায়, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি জোগায়।
নজরুল সাম্যের গানও গেয়েছেন। ‘নারী’ কবিতায় যেমন বলেছেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ তেমনি গানে নারীদের নিজ অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য কণ্ঠ তোলার আহ্বান জানিয়েছেন: ‘জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা।’ নজরুলের এই গানগুলো সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এখনও সমান প্রাসঙ্গিক।


