বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রায় স্থূলতার প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে, যার মূলে রয়েছে আধুনিক জীবনের ত্রিমাত্রিক এক সংকট— রাতে দেরি করে খাওয়া, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অবনতি। ব্যস্ততম নগরজীবনে কাজের চাপ, যানজটে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং স্ক্রিন নির্ভরতা— এই সবকিছুই রাতের খাবারের সময়কে ঠেলে দিচ্ছে গভীর রাতের দিকে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহজাদা সেলিমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনেকেই রাত ১১টা বা তারও পরে নৈশভোজ সারেন। শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ব্যাহত হওয়ায় রাতের বেলায় স্বাভাবিক বিপাকীয় হার ও ইনসুলিন সংবেদনশীলতা হ্রাস পায়। দিনের আলোতে একই পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করলে যে ক্যালরি খরচ হয়, রাতের বেলায় তার উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এই অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে চর্বি হিসেবে সঞ্চিত হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাঁরা নিয়মিত রাত ১০টার পরে খাবার খান, তাঁদের স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেক বেশি।
রাতের ভারী আহার ঘুমের মানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাকস্থলী সক্রিয় থাকার কারণে ঘুম গভীর হয় না, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা অস্থিরতার সমস্যা দেখা দেয়। আর ঘুমের এই ঘাটতি দেহে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। ৭ ঘণ্টার কম ঘুম হলে লেপটিন হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং ঘ্রেলিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা প্রবল ক্ষুধার অনুভূতি জাগায়। একইসঙ্গে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পায়। এর ফলশ্রুতিতে পরদিন উচ্চ কার্বোহাইড্রেট ও চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি তীব্র আসক্তি তৈরি হয় এবং রাত জাগার অভ্যাসের কারণে বিনা প্রয়োজনে রাতের বেলা খাওয়ার প্রবণতা— যা 'বিঞ্জ ইটিং' নামে পরিচিত— তরুণদের মধ্যে বাড়ছে। এই চক্রটি ওজন বৃদ্ধির একটি দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে।
তবে এই সংকট নিরসনের পথ খুব জটিল নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, রাতের খাবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা, রাতের আহার হালকা রাখা, ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো এবং প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার প্রশান্তিদায়ক ঘুম নিশ্চিত করা— এই চারটি অভ্যাসই স্থূলতা কমাতে ও বিপাকীয় সুস্থতা ফেরাতে অত্যন্ত কার্যকর। রাতের খাওয়া, ঘুমের মান ও স্থূলতা— এই তিনটি উপাদান গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তী জীবনযাপনই এই নীরব বিপাকীয় সঙ্কট মোকাবিলার প্রধান অস্ত্র।




