কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধুনিক চ্যাটবটগুলো এখন পাঠ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ছবি থেকেও ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়ে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছে। গুগল স্ট্রিট ভিউ থেকে নেওয়া ছবি বা সাধারণ আলোকচিত্র বিশ্লেষণ করে এআই লন্ডনের ‘দ্য স্ট্র্যান্ড’ নামক পরিচিত সড়ক কিংবা রাশিয়ার একটি প্রায় জনশূন্য রাস্তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং ক্লড—এই তিনটি মডেলকে লন্ডনের একটি রাস্তার ছবি সরবরাহ করা হলে তারা গাড়ির মডেল ও ভবনের স্থাপত্যশৈলী দেখেই অতিরিক্ত কোনো তথ্য ছাড়াই সঠিক উত্তর প্রদান করে। অন্যদিকে রাশিয়ার ফাঁকা একটি পথের ছবি থেকে গাছপালা ও রাস্তার একটি চিহ্ন ছাড়া আর কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকলেও তিনটি এআই দেশটির নাম সঠিকভাবে বলে দিতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট রাস্তার অবস্থান নির্ধারণে তারা ব্যর্থ হয়। ব্যক্তিগতভাবে তোলা ছবিতেও একই পরীক্ষা করা যায়; যদি ছবির পটভূমিতে পর্যাপ্ত পরিচিত চিহ্ন, দোকানের নামফলক বা স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকে, তবে এআই অনায়াসেই কারও অবস্থান অনুমান করে ফেলতে পারে।
এই সক্ষমতার পেছনে রয়েছে ইন্টারনেটের কোটি কোটি ছবি ও তথ্য পড়ার ক্ষমতা। কোন শহরের মোড়ে কোন ভাস্কর্য রয়েছে, কোন সমুদ্রসৈকতের পাশে কেমন গাছপালা জন্মায় অথবা কোন দেশে কোন রঙের ট্যাক্সি চলাচল করে—এসব বিস্তারিত তথ্য এআইয়ের প্রশিক্ষিত ডেটাবেসে সংরক্ষিত। ফলে জিওগেসার নামক অনলাইন গেমের মতোই এখন এআই চ্যাটবটগুলোও ছবি দেখে দ্রুত স্থান চিনে ফেলতে পারে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যদিও বিস্ময়কর, তবুও এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নতুন ও গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। অনলাইনে প্রকাশিত ছবি দেখে প্রতারক, হ্যাকার বা অপরাধীরা কারও বাড়ি, অফিস, স্কুল, কোচিং সেন্টার কিংবা ভ্রমণের স্থান সহজে শনাক্ত করতে পারে। এমনকি তারা এই তথ্য ব্যবহার করে মিথ্যা পরিচয় তৈরি করতে পারে বা কাউকে অনুসরণ করতে পারে।
পূর্বে ধারণা ছিল, ছবি পোস্টের আগে শুধু মেটাডেটা বা লোকেশন তথ্য মুছে ফেললেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু বর্তমানে ছবির দৃশ্যমান পটভূমির উপাদান—রাস্তার সাইনবোর্ড, দোকানের ব্যানার, ফুটপাতের নকশা বা গাড়ির মডেল—দেখেও অবস্থান অনুমান করা সম্ভব। তাই এখন মেটাডেটা অপসারণের পাশাপাশি এআইয়ের এই বিশ্লেষণ ক্ষমতাকেও মাথায় রাখতে হবে। নিরাপত্তা বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ছবি কোথায় ও কীভাবে শেয়ার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা। পোস্ট করার আগে ছবির পেছনের অংশ ঝাপসা করে দেওয়া, রেস্তোরাঁ বা দোকানের নাম ঢেকে দেওয়া কিংবা ছবিটি ক্রপ করে শুধু নিজের অংশটুকু রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। তবে এর চেয়েও সহজ ও দ্রুত পদ্ধতি হলো সোশ্যাল মিডিয়ার নিরাপত্তা সেটিংস সঠিকভাবে ব্যবহার করা।
ফেসবুকে কোনো ছবি পোস্ট করার আগে লেখার উপরের ড্রপ-ডাউন মেনু থেকে ‘পাবলিক’ না রেখে ‘ফ্রেন্ডস’ নির্বাচন করলে বন্ধু ছাড়া সাধারণ মানুষ বা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম সহজে ছবি দেখতে পাবে না। ইনস্টাগ্রামের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট ‘প্রাইভেট’ না থাকলে যে কেউই ছবি দেখতে পারে; এটি প্রতিরোধ করতে ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রোফাইলে ক্লিক করে নামের পাশে থাকা গিয়ার আইকনে যেতে হবে। সেখান থেকে ‘সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি’ হয়ে ‘অ্যাকাউন্ট প্রাইভেসি’তে গিয়ে ‘প্রাইভেট অ্যাকাউন্ট’ অপশনটি চালু করতে হবে। হোয়াটসঅ্যাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার; ছবি, স্টোরি বা স্ট্যাটাস শুধু ফোনে সংরক্ষিত নম্বরধারীরাই দেখতে পারে। বিভিন্ন গ্রুপ চ্যাটে পাঠানো ছবি ও ভিডিও বাইরের কারও দেখার সুযোগও থাকে না। অবশ্য একটি ঝুঁকি থেকে যায়—যার কাছে ছবি পাঠানো হয়েছে, সে নিজে সেটি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিতে পারে। তাই পরিচিতদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলে সতর্ক থাকা ভালো।
যদি কাজের প্রয়োজনে বা নিজের প্রচারের জন্য অনলাইনে ছবি সবাইকে দেখাতেই হয়, তবে পোস্টের সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ছবিতে যেন থাকার জায়গার কোনো ইঙ্গিত না থাকে, সেজন্য চারপাশের পটভূমি ক্রপ করে শুধু নিজের অংশটুকু রাখা উত্তম। একটি ছবি দেখে এআই বলে দিতে পারে কোথায় অবস্থান করছে—এই বিষয়টি মনে রাখলে কিছুটা উদ্বেগ হওয়াই স্বাভাবিক। তবে সামান্য সচেতনতা ও উপরে উল্লিখিত সহজ নিয়মগুলো মেনে চললে এআই বা কোনো ক্ষতিকর ব্যক্তি কারও অবস্থান সহজে বের করতে পারবে না। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে পপুলার সায়েন্স।




