যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পর্যটকরা কেবল খেলাই উপভোগ করেননি, বরং দেশটির বাস্তব চিত্রও প্রত্যক্ষ করেছেন। অনেকের ধারণা ছিল তারা একটি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে আসছেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়শই শিরোনাম হয়। কিন্তু বাস্তবে তারা দেখেছেন ভিন্ন এক চিত্র—উবার চালকদের উদার পরামর্শ, অপরিচিতদের নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানোর প্রবণতা এবং সর্বত্র মিলেছে অসাধারণ আতিথেয়তা। লন্ডনের ২৮ বছর বয়সী সেবাস্তিয়ান রিডার বলেন, ডালাসের এক ব্যক্তি তাকে নিজের ট্রাক দেখিয়ে ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনিয়েছেন, আর এক বারে দেখা অপরিচিত ব্যক্তি তাকে ও তার বন্ধুকে নিজের বারান্দায় বসিয়ে রাত ২টা পর্যন্ত সিনেমা ও খেলার আলোচনায় মগ্ন রেখেছেন। একই শহরের ৩০ বছর বয়সী হ্যারি গানস উবার চালক থেকে শুরু করে হোটেল কর্মী—সবার মধ্যে অতিথিপরায়ণতার 'অফুরান' প্রকাশ দেখেছেন। তার অনলাইন পোস্টে আমেরিকানরা খাওয়ার ও ঘুরার জন্য অজস্র পরামর্শ দিয়েছেন, কেউ কেউ তাকে বাড়িতে রান্না করে খাওয়ানোরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'বলা যায়, এখানে আসার পর থেকেই যেন নিজের বাড়ির মতো অনুভব করছি। ব্রিটেনে মানুষকে গলতে সময় লাগে, কিন্তু এখানে তাৎক্ষণিক আন্তরিকতা পাওয়া যায়।'
মরক্কোর ২৮ বছর বয়সী জিনেব বেনলামলিহ নিউ ইয়র্কে বিশ্বকাপ দেখতে এসে সেন্ট্রাল পার্কে ৫০ বছর বয়সী একদল মানুষের সাথে সালসা নাচতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, 'এখানে অচেনা কেউ যেন আপনার পরিবারের মতো হয়ে যায়—এটি সত্যিই চমৎকার।' ইংল্যান্ডের কার্লাইলের ভিক্টোরিয়া ফিলিপস-হান্টার নিজে হোটেল ব্যবসায়ী হওয়ায় এখানকার আতিথেয়তা শিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, 'আমেরিকায় কর্মীরা শতভাগ মনোযোগ দিয়ে গ্রাহকের সেবা করেন, টিপসের সংস্কৃতি তাদের প্রাপ্য।' তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমিগ্রেশন অফিসারদের নিয়ে ভিডিও দেখে প্রথমে ভীত ছিলেন, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা এত ইতিবাচক ছিল যে তিনি দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন।
পর্যটকরা মনে করছেন, মার্কিন রাজনীতির বিভক্তির চিত্র অনেকটাই মিডিয়া নির্ভর, বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে তেমনটা চোখে পড়েনি। ইংল্যান্ডের হ্যারি গানস বলেন, 'গণমাধ্যমে ধারণা দেওয়া হয় আমেরিকানরা অন্যদের গ্রহণ করতে নারাজ, কিন্তু বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।' পোল্যান্ডের বাসিন্দা রাফায়েল কোলাঙ্কোস্কি, যিনি বর্তমানে পিটসবার্গের এক স্কুলে কোচিং করান, বলেন, 'অন্যান্য দেশে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে প্রচার থাকে, কিন্তু এসে দেখলে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।' সেবাস্তিয়ান রিডার বলেন, তিনি এখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রত্যাশা করলেও জনগণকে বন্ধুসুলভ পেয়েছেন। তবে এই বিষয়টি এড়াতে তিনি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা না করার কৌশল নিয়েছেন—যা অনেক আমেরিকানই বুঝতে পারেন।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ পর্যটকদের অভিজ্ঞতা বলছে—আমেরিকার আসল চেহারা গণমাধ্যমের প্রচারিত চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি আতিথেয়তাপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ, যদিও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো বাস্তবতা থেকেই যায়।



