মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) দেশের মাটি থেকে রকেট ও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এক বৃহৎ পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করেছে। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্পারসোর কার্যালয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়া উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদপুর অথবা শরীয়তপুরে রকেট ও স্যাটেলাইটের বডি তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হবে, আর পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে রকেট উৎক্ষেপণ করা হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে প্রথম উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০ থেকে ৬০ বছর সময় লাগতে পারে।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (ডিডিসি) সঙ্গে চুক্তি করে স্পারসো। ওই মাস থেকেই সমীক্ষার কাজ শুরু হয়। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে ২০২৭ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে। কর্মশালায় ডিডিসির প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান জানান, বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ২০২৩ সালের ৬৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ১৩টি দেশের নিজস্ব রকেট উৎক্ষেপণ সক্ষমতা রয়েছে, তাই বাংলাদেশের জন্যও এটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে।

সমীক্ষায় প্রকল্পটি তিনটি স্থানে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কুয়াকাটায় রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্রের জন্য ৫ হাজার একর জমির প্রয়োজন হবে—এর মধ্যে মূল অবকাঠামোর জন্য ৩০০ একর, নিরাপত্তা বাফার জোনের জন্য ৫০০ একর এবং বাকি প্রায় ৪ হাজার ২০০ একর সহায়ক অবকাঠামোর জন্য। স্যাটেলাইট ও রকেটের বডি তৈরির কারখানার জন্য প্রয়োজন ৪০০ একর জমি, যা চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে হতে পারে। খুলনার খান জাহান আলী বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় প্রস্তাবিত স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জন্য ব্যবহার করা হবে ৩০০ একর জমি—এটি ইতিমধ্যে অনুমোদিত ৫৩৬ একর জমির অংশ।

ব্যয় ও আর্থিক সম্ভাব্যতা নিয়ে সমীক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণে মূলধনি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৬৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ৭টি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। তবে এ খাতের আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ঋণাত্মক ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাৎ ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি লাভজনক নয়। অন্যদিকে স্যাটেলাইট উৎপাদন হাবের আইআরআর ২১ শতাংশ, তবে স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আইআরআর ঋণাত্মক ৫ শতাংশ। ডিডিসির প্রতিনিধিদের মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ইতিবাচক হবে এবং একে ‘সার্বভৌমত্বের বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা উচিত।

স্পারসোর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নূর হোছাইন শরীফি বলেন, প্রচলিত বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব দিয়ে এই প্রকল্প বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষ্য, এটি একটি গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, যেখানে প্রকৃত মুনাফা হলো সৃষ্ট জ্ঞান। প্রাথমিক বিনিয়োগ স্বল্প মেয়াদে সরাসরি আর্থিক মুনাফা না দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা বিভিন্ন খাতে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে।

পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (ইসিআর) ২০২৩ অনুযায়ী প্রকল্পের তিনটি অংশই সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘রেড ক্যাটাগরি’র অন্তর্ভুক্ত, ফলে নির্মাণের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক। কুয়াকাটা উপকূলীয় এলাকাটি মোহনা বাস্তুতন্ত্র, প্লাবনভূমি ও পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মধ্যে পড়ে। সেখানে মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র এবং পরিযায়ী পাখির চলাচলের পথ রয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার ও উপকূল ক্ষয়ের ঝুঁকিও রয়েছে। চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে কারখানা নির্মাণে কৃষিজমির ওপর প্রভাব পড়তে পারে, তবে খুলনার শিল্পপার্কে পরিবেশগত ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তিনটি স্থান মিলিয়ে পাঁচ বছরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতি প্রশমন কার্যক্রমের জন্য প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, তবে এই বরাদ্দ যথেষ্ট কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আইনি কাঠামোর ঘাটতিও সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯১ সালের স্পারসো আইন মূলত গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, বেসরকারি মহাকাশ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এর কোনো এখতিয়ার নেই। বর্তমানে স্যাটেলাইট ও গ্রাউন্ড স্টেশনের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায়। কিন্তু আধুনিক বাণিজ্যিক মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা ‘স্পেস অ্যাক্ট’ এখনো প্রণীত হয়নি। এছাড়া জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা কনভেনশনের বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হবে।

জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সমীক্ষা। বর্তমানে স্পারসোর দক্ষতা দূর অনুধাবন ও ভূ-উপাত্ত বিশ্লেষণে সীমিত, তাদের রকেট প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট উৎপাদন বা শিল্পপার্ক পরিচালনার মতো বিশেষজ্ঞ জনবল নেই। প্রকল্পের শুরুতে ৪০০ থেকে ৬০৬ জন কর্মী প্রয়োজন হবে, যা পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে বেড়ে ৭৬৮ থেকে ১ হাজার ১৫১ জন হবে। শিল্পপার্ক পুরোপুরি চালু হলে সেখানে ভাড়াটে প্রতিষ্ঠানসহ ৫ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এ জন্য ভারতের ইসরো, জাপানের জাক্সা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থায় (ইএসএ) প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং বুয়েটে মহাকাশ প্রকৌশল বিভাগ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ, ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।