বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে বাংলাদেশের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও উন্মাদনার কমতি দেখা যাচ্ছে না। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সম্প্রতি লাল-সবুজ পতাকা হাতে দুই দলের খেলোয়াড়দের বেশ কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা কাঁধে দেশের পতাকা জড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। কিন্তু গভীর যাচাইয়ে দেখা গেছে, এসব কনটেন্টের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো।

ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার পর 'ফাইনালে উঠেই বাংলাদেশের পতাকা কাঁধে! হৃদয় জয় করল স্পেন'—এই শিরোনামে একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও প্রচারিত হয়। ভিডিওটিতে স্পেন দলের খেলোয়াড়দের বাংলাদেশের পতাকা হাতে মাঠে দৌড়াতে দেখা যায়, পাশাপাশি গ্যালারিতেও দর্শকদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা লক্ষ্য করা যায়। একই দাবি সম্বলিত একটি ফটোকার্ডেও বলা হয়, স্প্যানিশ খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশি সমর্থকদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করে কাঁধে পতাকা জড়িয়ে উদযাপন করেছেন। পোস্টটিতে ১৩ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া এবং কমপক্ষে এক হাজার শেয়ার পড়েছে।

গত ১৫ জুলাই 'Nokol Rɑj (NR)' নামের প্রায় ১০ লাখ ফলোয়ার বিশিষ্ট একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার বার দেখা গেছে, যেখানে ২৪ হাজারের মতো প্রতিক্রিয়া, ৬ হাজার শেয়ার এবং ৮০০টির বেশি মন্তব্য রয়েছে।

ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠার পর একই পেজ থেকে ১৬ জুলাই 'ফাইনালে উঠেই বাংলাদেশের পতাকা কাঁধে, হৃদয় জয় করলো আর্জেন্টিনা!'—শিরোনামে আরেকটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের বাংলাদেশের পতাকা হাতে উল্লাস করতে এবং গ্যালারিতে সমর্থকদের হাতে লাল-সবুজ পতাকা দেখা যায়। এছাড়া 'ফাইনালে উঠেই বাংলাদেশের পতাকা হাতে আর্জেন্টিনা! হৃদয় জিতে নিল ফুটবলপ্রেমীদের' শিরোনামে একটি ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়, যেখানে লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনা দলের কয়েকজন সদস্যকে বাংলাদেশের পতাকা হাতে দেখানো হয়। মেসির ছবিতে প্রায় চার হাজার প্রতিক্রিয়া পড়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ভিডিওটি প্রায় ১৬ লাখ বার দেখা গেছে, যেখানে ২২ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া, ৩ হাজার ২০০টির বেশি শেয়ার এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ মন্তব্য রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম, স্পেন বা আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম অথবা বাংলাদেশের কোনো সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। ভিডিও ও ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে একাধিক অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। খেলোয়াড়দের হাতে থাকা পতাকার আকার ও অবস্থান বিভিন্ন ফ্রেমে অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। দর্শকদের মুখের ভাব, অঙ্গভঙ্গি ও নড়াচড়া স্বাভাবিক নয় বলে মনে হয়েছে। খেলোয়াড়দের চলাফেরা ও দৃশ্যের বিভিন্ন অংশে এআই-নির্মিত কনটেন্টের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছে।

ভিডিও ও স্থিরচিত্রগুলো এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী একাধিক টুলে পরীক্ষা করা হলে সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ বলে ফলাফল আসে। এই পেজটি এর আগেও বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একাধিক ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়েছে, যার মধ্যে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের নামে একটি জাল বক্তব্যও রয়েছে যেখানে তাকে মেসির প্রশংসা করতে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তী যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় এমবাপ্পে কখনোই সেই মন্তব্য করেননি।