পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু পুলিশি গুলিতে ঘটেছে। গভীর রাতে তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থলে নেওয়ার সময় অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্যের রিভলবার কেড়ে নিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশের চালানো গুলিতে তার মৃত্যু হয় বলে সংস্থার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ভোটের আগে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার জানিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পথ অনুসরণ করা হবে। সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি এগিয়ে গেছেন। ইতিমধ্যে বিধানসভায় গুন্ডা দমন আইন পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এবার শুরু হয়েছে পুলিশি এনকাউন্টার। সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ‘বুলডোজার নীতি’ কার্যকর হয়ে গেছে বলে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য।
ঘটনার পর কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দল বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে শাসকদল বিজেপি তাতে কর্ণপাত না করে বরং নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। বিজেপি নেতারা বলছেন, সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মতে, ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ এই নীতিই অনুসরণ করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ বিজেপি নেতা মন্তব্য করেছেন, প্রথম সুযোগেই কঠোর বার্তা দেওয়া জরুরি ছিল, যাতে সবার কাছে প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
শুভেন্দু অধিকারী যাকে আদর্শ হিসেবে দেখছেন, সেই যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশ পুলিশি এনকাউন্টারে দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। চলতি বছরের ১৮ মে উত্তরপ্রদেশ সরকারের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের মার্চে যোগী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যে মোট ১৭ হাজার ৪৩টি পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। এই বন্দুকযুদ্ধগুলোতে ২৮৯ জন তথাকথিত কুখ্যাত অপরাধী নিহত এবং ১১ হাজার ৮৩৪ জন আহত হয়েছেন। গত নয় বছরে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি করে এনকাউন্টার হয়েছে বলে ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৮ জন পুলিশ সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন। মিরাট জোনে সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন অপরাধীর মৃত্যু হয়েছে, যেখানে এনকাউন্টারের সংখ্যা ৪ হাজার ৮১৩টি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী আসন বারানসি জোনে ১ হাজার ২৯২টি এনকাউন্টারে ২৯ জন নিহত হয়েছেন। আগ্রা জোনে ২ হাজার ৪৯৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৪ জন। লক্ষ্ণৌ, কানপুর, প্রয়াগরাজ, বেরিলি ও গাজিয়াবাদ এলাকায়ও একাধিক এনকাউন্টারের তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগেও এনকাউন্টারের অধ্যায় রয়েছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় নকশাল দমনের নামে পুলিশকে নির্বিচার হত্যার অনুমতি দিয়েছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, সেই সময়ে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার নকশালপন্থী তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মী এনকাউন্টারে নিহত হন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপকদের এক কমিটির হিসাব অনুযায়ী, শুধু কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাতেই ৬ হাজারের বেশি নকশাল সমর্থকের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারী যোগী আদিত্যনাথের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে অর্ধশতাব্দী পর পশ্চিমবঙ্গে আবার সেই এনকাউন্টার যুগ ফিরে আসতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছে বিশ্লেষক মহল।
বিজেপির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলা হচ্ছে, অপরাধীরাই ভয় পাবেন; যারা শান্তিপ্রিয় ও নিরপরাধ তাদের ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু বিরোধী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে এই নীতির সমালোচনা করছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও তা উপেক্ষা করে তিনি নিজের পথে এগিয়ে চলেছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও কি সেই পথেই হাঁটবেন? রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




