সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি তাদের কাজ শেষ করে এখন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। সচিবালয়ে সোমবার আয়োজিত শেষ বৈঠকে কমিটির সদস্যরা চলতি অর্থবছর থেকেই কেবল মূল বেতন প্রদান এবং পরবর্তী অর্থবছর থেকে ভাতা চালু করার পক্ষে মত দেন। এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে পাঠানো হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। এক দফা সময় বৃদ্ধির পর কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রচলিত ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে কমিশন।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সক্রিয় কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য গঠিত নাসিমুল গনি কমিটি প্রথমে তিন অর্থবছরে এবং পরে দুই অর্থবছরে বিভক্ত করে বাস্তবায়নের খসড়া তৈরি করে। সর্বশেষ বৈঠকে সদস্যরা দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেন।
স্বাস্থ্যসেবাসচিব, আইনসচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকসহ বিভিন্ন সচিব ও শীর্ষ কর্মকর্তা এ কমিটির সদস্য। সূত্র জানায়, বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি হবে। বিচার বিভাগের বেতনকাঠামো নিয়ে কিছু কারিগরি জটিলতা ছিল, যা সমাধান হয়েছে বলে কমিটির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, অথচ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বহু বেড়েছে। তবে সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘ইনোভেশন শোকেসিং’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসন-নিট খাতে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য নির্ধারিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বরাদ্দ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুত রয়েছে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আইনি পরীক্ষার জন্য বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। সেখানে ভেটিং শেষ হলে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে এটি আগামী মন্ত্রিসভায় বা তার পরের মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এক সপ্তাহ আগেই, এখন শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা।




