কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসার ও ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গভর্নর ও বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিশ্রুতি সই করেছেন, যার লক্ষ্য ডেটা সেন্টার থেকে সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি চাপ থেকে রক্ষা করা। তবে এই উদ্যোগ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিতর্কের মুখে পড়েছে, কারণ ভোক্তারা ইতিমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সংকটে রয়েছেন। ট্রাম্প গত মার্চে প্রথম এ প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করলেও তা জনমনে স্বস্তি দিতে পারেনি। ভোক্তারা উদ্বিগ্ন যে বিলিয়নিয়ার-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও জমির প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়বেন।

পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থায় (ইপিএ) দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে জনমত গঠনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, 'আপনাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়কে বোঝাতে হবে। এর বিরোধিতা করা যাবে না। বরং এর সঙ্গে যেতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'যদি আপনারা এই অর্থ না নেন, তাহলে অন্য কেউ তা নিয়ে নেবে। বরং আপনরাই নিন।' ট্রাম্পের দাবি, এই প্রতিশ্রুতির ফলে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকবে এবং ভোক্তাদের বিল কমে যাবে। তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, ডেটা সেন্টার নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে কি না তা অনিশ্চিত।

শ্বেতভবন জানিয়েছে, এই প্রতিশ্রুতিতে ২৩ জন গভর্নর ও অন্তত ১৮৭টি কোম্পানি সই করেছে। এর মধ্যে নেক্সটএরা এনার্জি, ডিউক এনার্জি, আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ার, সাউদার্ন কোম্পানি ও প্যাসিফিক গ্যাস অ্যান্ড ইলেকট্রিকের মতো বড় ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডেটা সেন্টার ডেভেলপারদের মধ্যে ইকুইনিক্স, ডিজিটাল রিয়াল্টি ও প্রোলজিস নাম অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, কনসাল্টিং ফার্ম আইসিএফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে মাসিক বিদ্যুৎ বিল ১৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই আশঙ্কায় ডেটা সেন্টার বিরোধিতা এখন দ্বিদলীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভোটাররা পরিবেশগত প্রভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহার এবং ডেটা সেন্টারগুলো তাদের এলাকাকে আরও ব্যয়বহুল ও বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে বলে উদ্বিগ্ন।

ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলোর দাবি, এগুলো স্কুল জেলাগুলোর জন্য কর রাজস্ব বাড়ায় এবং বাড়ির মালিকদের সম্পত্তি করের বোঝা কমায়। তবে টেক্সাসের গ্রামীণ এলাকায়ও এই বিরোধিতা ছড়িয়ে পড়েছে। ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জিনা হিনোজোসা গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, 'এই ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন। আমরা সবাই এর বিল দিচ্ছি। কোনো নিয়ম নেই, এটি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত।' নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এক বছর ধরে নতুন বড় সার্ভার ওয়্যারহাউস নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছেন। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস একটি আইন স্বাক্ষর করেছেন যা ইউটিলিটিগুলোকে ডেটা সেন্টারের খরচ আবাসিক ও ছোট ব্যবসায়িক গ্রাহকদের ওপর চাপাতে বাধা দেবে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভা বা ইউটিলিটি কমিশন ডেটা সেন্টারগুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ খরচ বহনের শর্ত জারি করেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় শিল্পটি ভোক্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করছে বলে ইউটিলিটি রিফর্ম নেটওয়ার্কের আইনজীবী ম্যাথিউ ফ্রিডম্যান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'এটি হতাশাজনক যে একই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যারা ভোক্তা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তারা রাজ্য স্তরে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করছে।' এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং সম্প্রতি বলেছেন, এআই বিকাশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ঘাটতি একটি দুর্বলতা। গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, ওরাকল, এক্সএআই, ওপেনএআই ও অ্যামাজনসহ বড় কোম্পানিগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের 'রেটপেয়ার প্রটেকশন প্লেজ'-এ সই করলেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শ্বেতভবন অভিযোগ করেছে, পিজেএম ইন্টারকানেকশন—যা ১৩টি অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ তদারকি করে—এআই-চালিত চাহিদার মধ্যে যুক্তিসঙ্গত দামে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শ্বেতভবনের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেছেন, পিজেএমকে তার স্টেকহোল্ডার প্রক্রিয়া ও বোর্ড গভর্নেন্স সংস্কার করতে হবে। এছাড়া হাউস এনার্জি অ্যান্ড কমার্স কমিটি একটি দ্বিদলীয় বিল অনুমোদন করেছে, যা ডেটা সেন্টারগুলোকে গ্রিড আপগ্রেডের ব্যয় বহনে বাধ্য করবে।

সামগ্রিকভাবে, ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি মন্থর হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং চীনের কাছে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা চালক, বিশ্লেষক ও সফটওয়্যার ডেভেলপারের মতো চাকরিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যা জনমনে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।