রাশিয়ার বৃহত্তম ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ওয়াইল্ডবেরিজের বিপুল পরিমাণ গুদামে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা চালানোর ঘটনা নতুন করে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র সামনে এনেছে। গত সপ্তাহান্তে কিয়েভের ড্রোনগুলো প্রথমে কয়েকটি স্থাপনায় আঘাত হানে এবং এরপর সপ্তাহজুড়ে আরও পাঁচটি ওয়াইল্ডবেরিজ গুদাম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যার মধ্যে ২০১৪ সালে রাশিয়ার অবৈধ দখলে যাওয়া ক্রিমিয়ার একটি স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত। এই হামলায় মোট নয়জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ার স্তম্ভের ছবি পুরো ঘটনার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে।

২০০৪ সালে তাতায়ানা কিম নামের এক তরুণী শিক্ষক ও মা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ওয়াইল্ডবেরিজ শুরুতে কেবল পোশাক বিক্রি করলেও বর্তমানে এটি দেশটির ই-কমার্স খাতে শীর্ষস্থানীয় নাম। বেগুনি রঙের লোগো চিহ্নিত এই প্রতিষ্ঠানটি ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীকে তাদের পণ্য সারা দেশে সরবরাহ করতে সহায়তা করে। এপ্রিলে ফোর্বস রাশিয়া কিমের সম্পদের পরিমাণ ৮.১ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করেছিল। পোশাক, বই, প্রসাধনী, খেলনা, গৃহস্থালী জিনিসপত্র থেকে শুরু করে ভ্রমণ টিকিট ও হোটেল বুকিং পর্যন্ত সব কিছুই পাওয়া যায় এই প্ল্যাটফর্মে। ২০২১ সালে কিম একটি ছোট ব্যাংক কিনে ওয়াইল্ডবেরিজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে।

কিয়েভের দাবি, যে স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে সেগুলো রুশ সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত উপকরণ সরবরাহ করত। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইউক্রেন বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানছে। ওয়াইল্ডবেরিজের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান চালিয়ে এমন অনেক পণ্য পাওয়া গেছে যা বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজেই ব্যবহার করা যায়, যেমন বডি আর্মার, হেলমেট, রেডিও ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস। কিছু পণ্যের বিবরণে 'এসভিও-তে পরীক্ষিত' বা 'এসভিও যোদ্ধাদের পছন্দ' লেখা ছিল, যা ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার ব্যবহৃত 'বিশেষ সামরিক অভিযান' শব্দগুচ্ছকে ইঙ্গিত করে।

হামলায় রাশিয়ার অসংখ্য ছোট ব্যবসা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মস্কোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডাটা ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক সের্গেই সেমকোর মতে, ওয়াইল্ডবেরিজ ও তার প্রতিযোগী ওজোন ও ইয়ানডেক্স মার্কেটের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো রুশ কারিগর ও উদ্যোক্তাদের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছিল। শনিবার থেকে সামাজিক মাধ্যমে বহু ব্যবসায়ী তাদের পণ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় কান্নাজড়িত বক্তব্য পোস্ট করেছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন হলেও সেমকো অনুমান করছেন যে, মস্কো, তাম্বভ, ক্রাসনোদার ও স্তাভ্রোপোল অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত গুদামগুলোতে ওয়াইল্ডবেরিজের মোট গুদাম স্থানের প্রায় ১২ শতাংশ অবস্থিত ছিল এবং সেখানে সংরক্ষিত পণ্যের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।

ওয়াইল্ডবেরিজের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতাদের সহায়তায় স্টোরেজ ফিতে ছাড়, পণ্য অন্যত্র বিনামূল্যে স্থানান্তর ও ওয়াইল্ডবেরিজ ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত। সম্প্রতি কোম্পানি তার বিক্রেতা নীতি পরিবর্তন করে 'ফোর্স ম্যাজেউর' (যার মধ্যে ড্রোন হামলাও পড়ে) কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের দায় থেকে নিজেকে অব্যাহতি দিয়েছে। বুধবার তাতায়ানা কিম জানান, ইলেকট্রোস্টাল গুদামের ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান শুরু হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়া হবে।

ম্যাক্রো-অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের সিইও ক্রিস উইফারের মতে, ২০২২ সালের পর রাশিয়ার অনলাইন খুচরা খাত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এটি মোট খুচরা বিক্রির প্রায় ২০ শতাংশ দখল করে আছে। যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো রাশিয়া ছাড়ার পর ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজোন এশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ক থেকে একই ধরনের পণ্য সংগ্রহ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। উইফার মনে করেন, গুদাম হামলা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। বরং এই হামলার মূল লক্ষ্য জনমনে প্রভাব ফেলা এবং মানুষকে যুদ্ধ সম্পর্কে আরও বেশি আলোচনায় আনা। তিনি বলেন, ২০২২ সালের পর সাধারণ রুশ নাগরিকরা যুদ্ধকে দূরের ঘটনা হিসেবে দেখলেও চলতি বছরে তেল শোধনাগারে হামলা ও ওয়াইল্ডবেরিজের ঘটনা তাদের নজর কেড়েছে। এখন অনেক বেশি মানুষ প্রশ্ন করছে কেন যুদ্ধ এত দীর্ঘ হচ্ছে এবং এর কারণ কী। এই হামলা যুদ্ধকে তাদের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।