ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। আন্দোলনস্থলের কাছে কেরালা হাউস ভবনের বাইরে দিল্লি পুলিশ দুটি অত্যাধুনিক নজরদারি যান মোতায়েন করেছে। বড় যানটির নাম ‘মোবাইল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ভেহিকেল’, যেখানে পুলিশ সদস্যরা সিসিটিভি ক্যামেরার সরাসরি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করছেন। অপর যানটির নাম ‘ইক্ষণ’, যা একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা। এই ভ্যানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রতিটি মুখের চারপাশে সবুজ বক্স তৈরি করে পুলিশের অপরাধী তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে।

পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিচিত অপরাধীদের শনাক্ত করাই এই প্রযুক্তির লক্ষ্য। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে। রাজস্থানের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি ও তার বন্ধুরা পোস্টার নিয়ে আন্দোলন করলেও ক্যামেরার ভয়ে মুখ ঢেকে রাখছেন, কারণ তারা সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং পুলিশের তালিকায় নাম যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, তার পরিবার আন্দোলনের বিষয়ে জানে না, তাই ভিডিও ফুটেজ যদি তাদের কাছে পৌঁছে যায় তবে সমস্যা হবে।

দিল্লি পুলিশের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ভিডিও কত দিন সংরক্ষণ করা হবে তা নির্দিষ্ট নয়; তদন্তের প্রয়োজন হলে পরে ব্যবহার করা হতে পারে। এই নজরদারি নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জও এসেছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতি আইশে ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ করেছেন, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে নজরদারি চালাচ্ছে, যা গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন করে।

২০ জুলাই শুনানিতে পুলিশের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, ভিডিও ও ছবি ধারণের উদ্দেশ্য শুধু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নজরদারি বা গুপ্তচরবৃত্তি নয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চেয়েছে আদালত। এই প্রযুক্তির ব্যবহার ডিজিটাল পারসোনাল ডেটা প্রটেকশন আইন, ২০২৩-এর আওতাভুক্ত হলেও আইনে পুলিশের মতো নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা অনেক সুরক্ষামূলক বিধানকে অকার্যকর করে।

ভারতজুড়ে পুলিশি ব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, ফেসিয়াল রিকগনিশন, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর) ও এআই-ভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। কতৃপক্ষ বলছে, এসব প্রযুক্তি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে নাগরিক অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, গোপনীয়তা, প্রয়োজনীয়তার সীমা, স্বচ্ছতা ও নজরদারি নিয়ন্ত্রণে পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। ২০২২ সালে তথ্য অধিকার আইনের এক জবাবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থা ৮০ শতাংশ নির্ভুলতা দেখালে সেটিকে 'ইতিবাচক মিল' হিসেবে গণ্য করা হয়।