অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা পরিবর্তনের ইচ্ছা অনেকের মনেই জাগে। হতে পারে তা পরীক্ষায় খারাপ ফল বা বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্যের মতো ব্যক্তিগত বিষয়, কিংবা ২০১৯ সালের কোভিড মহামারির মতো বিশ্বব্যাপী ঘটনা। কল্পবিজ্ঞানের গল্পের বাইরে বাস্তবে এখনো কোনো সময় ভ্রমণকারীর দেখা মেলেনি। তবে বিজ্ঞানীরা কিন্তু এ বিষয়ে নীরব নেই। পদার্থবিজ্ঞান, গণিত এবং দর্শনের মতো শাখাগুলো কয়েক দশক ধরে সময় ভ্রমণের ধারণা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বই সময় ভ্রমণের বৈজ্ঞানিক ধারণার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ১৯০৫ সালে তিনি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং ১৯১৫ সালে সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই দুই তত্ত্ব বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছে। আইনস্টাইনের মতে, সময় এবং স্থান কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এগুলো প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে। একটি লোহার রডের দৈর্ঘ্য যেমন সব জায়গায় এক থাকে না, তেমনি এক সেকেন্ডের দৈর্ঘ্যও পরিবর্তনশীল।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই এমনটা অনুভব করি। বিরক্তিকর কোনো কাজে সময় যেন আর ফুরায় না, আবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় উড়ে যায়। কিন্তু আইনস্টাইন শুধু এই মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতির কথা বলেননি, তিনি সময়ের প্রকৃত দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের কথা বলেছেন। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীতে মাপা এক সেকেন্ড আর মহাকাশে ঘুরতে থাকা স্যাটেলাইটে মাপা এক সেকেন্ড কখনোই হুবহু এক নয়।

বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো পর্যবেক্ষক খুব দ্রুতগতিতে চললে তার জন্য সময় ধীরে চলে। যদি কেউ আলোর গতির ৯৭ শতাংশ গতিতে চলা মহাকাশযানে চড়ে পাঁচ বছর মহাকাশ ভ্রমণ করে পৃথিবীতে ফেরে, তখন পৃথিবীতে ২০ বছর পেরিয়ে যাবে। নাসার মহাকাশচারী স্কট কেলি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ১১ মাস কাটানোর পর পৃথিবীতে ফিরে এসে তার যমজ ভাইয়ের চেয়ে ১৩ মিলি-সেকেন্ড কম বয়সী হয়ে গিয়েছিলেন। এই ঘটনা ‘টুইন প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত।

শুধু গতিই নয়, মহাকর্ষ বা ত্বরণের কারণেও সময়ের গতি পরিবর্তিত হয়। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, মহাকর্ষ আসলে একটি জ্যামিতিক প্রভাব। ভর ও শক্তি (E=mc²) স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেয়, আর এই বাঁকানো স্থানকালই ভারী বস্তুগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করে। বিশাল ভরের নক্ষত্রগুলো স্পেসটাইমের চাদরে বক্রতা তৈরি করে, যার কারণে গ্রহগুলো তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়। যে বস্তুর ভর যত বেশি, তার কাছাকাছি সময় তত ধীরে চলে। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ চলচ্চিত্রে এই বিষয়টি দেখানো হয়েছে, যেখানে ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি গিয়ে নভোচারীর কয়েক মাস কেটে গেলেও পৃথিবীতে তার মেয়ের কয়েক দশক কেটে যায়।

সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গাণিতিক সমীকরণগুলো তাত্ত্বিকভাবে অতীতে ভ্রমণেরও অনুমতি দেয়। এটি সম্ভব হয় ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভস বা বদ্ধ স্থান-কাল বক্ররেখার মাধ্যমে। এই রেখা ধরে ভ্রমণ করলে একজন ব্যক্তি স্পেসটাইমের কোনো একটি বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে অতীতের দিকে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শুরুর সময় ও স্থানে ফিরে আসে। ডাচ গণিতবিদ উইলেম জ্যাকব ভ্যান স্টকুম ১৯৩৭ সালে প্রথম এই গাণিতিক সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। তবে ১৯১৫ সালে তত্ত্ব প্রকাশের পর এই সত্য বুঝতে ২২ বছর লেগেছিল, কারণ আইনস্টাইনের সমীকরণের অসংখ্য সমাধান রয়েছে, যার প্রতিটি ভিন্ন মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়। বিজ্ঞানীরা আমাদের মহাবিশ্বের সঙ্গে মেলে এমন সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সেই গণিত অত্যন্ত জটিল।

আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশনগুলো মূলত ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন, যা স্থান ও কালের সঙ্গে স্পেসের বক্রতার পরিবর্তন বর্ণনা করে। সমীকরণের বাঁ দিক স্থানের জ্যামিতি নিয়ে কাজ করে, যেখানে Λ হলো কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নির্দেশ করে। ডান দিকটি মহাবিশ্বের ভর ও শক্তির বণ্টন নিয়ে কাজ করে। ১৯১৬ সালে কার্ল সোয়ার্জশিল্ড স্থির, গোলাকার বিশাল ভরের বস্তুর চারপাশের স্পেসটাইমের জন্য প্রথম সমাধান বের করেন। ১৯৬৩ সালে গণিতবিদ রয় কের ঘূর্ণায়মান ভরের জন্য সমাধান বের করেন, যা প্রমাণ করে যে এই সিস্টেমে বদ্ধ টাইমলাইক কার্ভ তৈরি সম্ভব, অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে অতীতে ভ্রমণ সম্ভব। তবে সমস্যা হলো, কের স্পেসটাইমের যে অংশে অতীত ভ্রমণ সম্ভব, সেটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। সেখানে সামান্য পরিবর্তন হলেই পুরো এলাকা ভেঙে পড়ে। তাঁর সমাধান ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের বাইরের স্পেসটাইম ভালোভাবে ব্যাখ্যা করলেও, ব্ল্যাকহোলের একদম কাছে গিয়ে ব্যর্থ হয়, আর ঠিক সেই জায়গাতেই অতীত ভ্রমণের পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।