চলমান জ্বালানি সংকটের পরও দেশের অর্থনীতির চাকা গত জুলাই মাসে অধিক গতিতে ঘুরেছে, যেখানে মূল ভূমিকা রেখেছে উৎপাদন খাতের শক্তিশালী পুনরুদ্ধার। সেবা ও কৃষি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনের মধ্যেই রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্রে একটি নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) নামে পরিচিত এই সূচকটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত মাসে এই সূচকটি ৪ দশমিক ৯ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে, যা জুন মাসে ছিল ৫২ দশমিক ৯। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সূচক প্রকাশ করে থাকে। রোববার তারা জুলাই মাসের সর্বশেষ তথ্যটি জনসমক্ষে আনে।

কৃষি, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা—এই চারটি প্রধান খাতের ৪০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পিএমআই প্রণয়ন করা হয়। কাঁচামাল ক্রয়, নতুন অর্ডার, কর্মসংস্থানসহ নানা দিক সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। সূচকটির মান ৫০-এর ওপরে থাকলে অর্থনীতির সম্প্রসারণ ধরা হয়, আর ৫০-এর নিচে নামলে সংকোচন হিসেবে বিবেচিত হয়।

কৃষি খাত টানা ১১ মাস সম্প্রসারণের ধারা বজায় রাখলেও গত মাসে তার গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। জুনে ৬৫ দশমিক ৮ থাকা এই খাতের সূচক জুলাইয়ে ৯ দশমিক ৬ পয়েন্ট কমে ৫৫ দশমিক ২-এ নেমে এসেছে। নতুন ব্যবসা ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের মধ্যে থাকলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সামান্য সংকোচন লক্ষ্য করা গেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে উৎপাদন খাতে। ১৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট বেড়ে সূচকটি ৬৫ দশমিক ৪-এ উন্নীত হয়েছে, যা সামগ্রিক পিএমআই বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। নতুন অর্ডার, রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন কার্যক্রম, উপকরণ সংগ্রহ, আমদানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণের চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেও অসমাপ্ত অর্ডারের সংখ্যা এখনো সংকোচনের মধ্যেই রয়েছে।

সেবা খাত ২২ মাস ধরে সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এই খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫৬-এ পৌঁছেছে, যা নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও উপকরণ ব্যয়ে দ্রুততর সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। অসমাপ্ত অর্ডারের সংকোচনের হারও কমেছে।

বিপরীতে, নির্মাণ খাতের অবস্থা এখনো ভালো নয়। জুলাইয়ে এই খাতের পিএমআই ৪৯ দশমিক ৩, যা জুনের তুলনায় ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নতি হলেও এখনো সংকোচনের সীমারেখার নিচে। নতুন ব্যবসা, নির্মাণ কাজ ও কর্মসংস্থানের সংকোচন কমলেও উপকরণ ব্যয় ও অসমাপ্ত অর্ডারের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ এই প্রসঙ্গে বলেন, জুলাইয়ের পিএমআই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে উৎপাদন খাতের পুনরুদ্ধার এবং কৃষি ও সেবা খাতের টেকসই সম্প্রসারণ। উৎপাদন খাতের এই অগ্রগতি গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও নির্মাণ খাতের সামান্য সংকোচন অব্যাহত থাকায় পুরো অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।