দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা ৪২টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের বিদেশে পাচার করা অর্থ-সম্পদ ফেরত আনতে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে ব্যাংক লুট ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্তের ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয় দফায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ৩৮টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে নামে-বেনামে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ শনাক্ত করে তা উদ্ধারের লক্ষ্যে বৈশ্বিকভাবে খ্যাত আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া চলছে।
যেসব ব্যাংক এখনো এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন করেনি, তাদের দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সভায় জানানো হয়, 'নো উইন, নো পে' নীতিতে এই সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংককে অগ্রিম কোনো অর্থ প্রদান করতে হবে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব খরচে সম্পদ অনুসন্ধান করবে এবং উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ এবং সাদ মুসা গ্রুপ।
এসব প্রতিষ্ঠানের পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের দায়িত্ব পেয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, চুক্তিবদ্ধ আন্তর্জাতিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন এবং আর্থিক পরিমাণ শনাক্তে কাজ করছে। সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় তা জব্দ করা হবে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে সম্পদ বিক্রয় বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই উদ্যোগের ফলে পাচার করা জাতীয় সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ও সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।




