বিচারিক কার্যক্রম তিন সপ্তাহ ধরে চলার পর সোমবার প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য উপস্থাপন শেষ করা হয়। এরপর প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করেন। মামলার মূল অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সি, যিনি ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ম্যাসাচুসেটসের নিজ বাড়িতে তিন শিশুকে হত্যার অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী কোরা, তিন বছরের ডসন এবং মাত্র আট মাসের কল্যান রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ল্যান্সি ফিটনেস ব্যান্ড ব্যবহার করে শিশুদের শ্বাসরোধ করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে ঝাঁপ দেন। ওই পতনের ফলে তার শরীরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে ৩৬ বছর বয়সে তিনি হুইলচেয়ারে বসেই আদালতের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তিনি প্রথম-ডিগ্রি হত্যার তিনটি অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও দোষ স্বীকার করেননি; তার আইনজীবীরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে ঘটনাকালীন সময়ে তিনি প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকার, অর্থাৎ পোস্টপার্টাম সাইকোসিসে আক্রান্ত ছিলেন।
মঙ্গলবার আদালতে সাক্ষ্য দেন তার সাবেক শাশুড়ি সুজান ক্ল্যান্সি। তিনি জানান, শিশুরা মারা যাওয়ার অনেক আগে থেকেই লিন্ডসে সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছিলেন। তার মধ্যে ঘুমহীনতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, তীব্র উদ্বেগ ও গভীর বিষণ্নতা দেখা দিয়েছিল। "তিনি সাহায্যের জন্য কাতর অনুরোধ করছিলেন," বলেন সুজান। তার মতে, লিন্ডসে সবসময়ই চিকিৎসকের কাছে যেতে এবং সুস্থ হতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি লিন্ডসেকে একজন অত্যন্ত স্নেহময়ী, যত্নশীল ও মাতৃসুলভ নারী হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রসিকিউশন পক্ষ অবশ্য ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করেছে। তাদের মতে, ক্ল্যান্সির কর্মকাণ্ড কোনো মানসিক বিভ্রান্তির ফলাফল নয়; বরং তিনি সচেতনভাবে ও পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের হত্যা করেছেন। তারা আদালতে দাবি করেন যে এটি ছিল একটি ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত।
প্রতিরক্ষার উপস্থাপিত সাক্ষ্যে ক্ল্যান্সির মানসিক অবস্থার অবনতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মা পলা মাসগ্রোভ সোমবার আদালতে বলেন, লিন্ডসে সবসময়ই বহু সন্তান নিয়ে একটি বড় পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং মাতৃত্ব তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার ঘুমের সমস্যা তীব্র হয় এবং তিনি একটি বার্তায় জানান যে তিনি "খুবই অসুস্থ" বোধ করছেন। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে লিন্ডসে তার বাবা-মা ও তৎকালীন স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান যে তার মনে সন্তানদের ক্ষতি করার চিন্তা আসছে। তিনি বারবার বলতেন, "এটা আমি নই, আমি আগে কখনো এমন ছিলাম না।" তার মা সাক্ষ্য দেন যে তিনি নিজেও মনে করতেন এটি তার মেয়ের স্বাভাবিক আচরণ নয়।
ক্ল্যান্সির বোন অ্যালিসন ওজগা এর আগে আদালতে জানান, হত্যার আগের এক মাস ধরে লিন্ডসের মনে প্রতিদিন আত্মহত্যার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি নিজেই একটি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি হন এবং সেখানে কয়েক দিনের জন্য চিকিৎসা নেন। প্রতিরক্ষা পক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, কনিষ্ঠ সন্তান কল্যানের জন্মের পর থেকেই লিন্ডসে বিভ্রম ও অলীক কল্পনার শিকার হতে থাকেন এবং তিনি নিয়মিত মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
এই মামলায় প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকারের চিকিৎসাবিজ্ঞানগত ব্যাখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) এই অবস্থাকে একটি বিরল কিন্তু গুরুতর মানসিক অসুস্থতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা সন্তান জন্মের পরপরই প্রভাব ফেলতে পারে। সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলেছে, এটি "বেবি ব্লুজ" থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং একে একটি চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা হিসেবে গণ্য করা উচিত।




