আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। প্রথম এশিয়া প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে (এপিওএআই) বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা তিনটি স্বর্ণপদক অর্জন করেছে, যা এই আসরে কোনো দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ সংখ্যক স্বর্ণপদক। ২৬ জুন রাতে ফলাফল প্রকাশের পর এই তথ্য জানা যায়। ১৩ জুন অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, জাপানসহ মোট ১৮টি দেশ অংশ নেয়।

বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াড (বিডিএআইও)-এর মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য দল নির্বাচন করা হয়। পূর্বে কেবল ঢাকায় আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হলেও এবার প্রথমবারের মতো দেশের ছয়টি ভেন্যুতে—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে সরাসরি এবং রাজশাহী, খুলনা ও অন্যান্য অঞ্চলে অনলাইনে—আঞ্চলিক বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ২ থেকে ১০ মে পর্যন্ত চলা এই পর্বে কুইজ ও কোডিং রাউন্ড মিলিয়ে প্রায় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ১৬ মে ঢাকায় ফাইনাল রাউন্ডের পর সেরা ৩০ জনকে নিয়ে ২০ থেকে ২৩ মে ন্যাশনাল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। সেখান থেকে সিলেকশন কনটেস্ট ও ভাইভার মাধ্যমে আট সদস্যের বাংলাদেশ দল গঠিত হয়।

দলে সুযোগ পান হোমনা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মো. সাইদুজ্জামান আরাফ, নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির ত্রিদিব রায় আর্য, দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির নাওফিল রহমান, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিলের একাদশ শ্রেণির নাঈরা নাওয়ার আহমেদ, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির অনন্য যারিফ আকন্দ, নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির মোবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির মুরতাযা আবদুল্লাহ।

প্রতিযোগিতার জন্য দলটিকে ৫ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত তিন দিনের বিশেষ ক্যাম্প দেওয়া হয়, যা মূল কনটেস্টের আদলে ডিজাইন করা হয়েছিল। এতে দুটি অফিশিয়াল প্র্যাকটিস কনটেস্ট অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরীক্ষার হলে ভিডিও রেকর্ডিং এবং প্রত্যেকের স্ক্রিন ওবিএস স্টুডিও সফটওয়্যার দিয়ে রেকর্ড করা হয়। পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক এআই অলিম্পিয়াডে পদকজয়ী আরেফিন, ইনান, রাহিক ও রাফিদের অভিজ্ঞতা এই প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৩ জুন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার কনটেস্টে চারটি মেশিন লার্নিং সমস্যা সমাধান করতে হয়। প্রথম সমস্যাটি ছিল স্লোন ডিজিটাল স্কাই সার্ভের ডেটাসেট ব্যবহার করে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ও কোয়াজার শনাক্তকরণ মডেল তৈরি। দ্বিতীয়টি অডিও ক্ল্যাসিফিকেশন—হাঁচি, হাসি, কান্না, সাইরেন, কুকুরের ডাকসহ দশ ধরনের শব্দ শনাক্তকরণ। তৃতীয় সমস্যায় অণুর গাঠনিক কাঠামো থেকে এনার্জি প্রপার্টি অনুমানের মডেল তৈরি করতে হয়। চতুর্থ ও শেষ সমস্যাটি ছিল ইমেজ প্রসেসিং—ইনফ্রারেড ক্যামেরা ট্র্যাপে তোলা ৫৩টি চিতাবাঘের ছবি থেকে প্রতিটি চিতাবাঘকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার মডেল তৈরি।

কনটেস্ট চলাকালে দুটি ক্যামেরা দিয়ে পুরো রুমের ভিডিও রেকর্ড করা হয় এবং তা চীনের আয়োজক কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়। প্রতিযোগীদের কম্পিউটার স্ক্রিনও ওবিএস স্টুডিও দিয়ে রেকর্ড করা হয়। ফলাফল যাচাই-বাছাই শেষে ২৭ জুন ফল ঘোষণা করা হয়। তাতে দেখা যায়, লাবিব শাহরিয়ার (চতুর্থ স্থান), মো. সাইদুজ্জামান আরাফ (পঞ্চম স্থান) ও ত্রিদিব রায় আর্য (নবম স্থান) স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন। নাওফিল, নাঈরা, অনন্য ও প্রিয়ম সম্মানজনক স্বীকৃতি পান। মুরতাযাও সম্মানজনক স্বীকৃতির খুব কাছে পৌঁছেছিলেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সৌদি আরব, চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ভিয়েতনাম, হংকংয়ের মতো দেশের ঝাঁ-চকচকে ভেন্যুর তুলনায় বাংলাদেশের ভেন্যুটি ছিল অত্যন্ত সাদামাটা—শুধু একটি রুমে কয়েকটি কম্পিউটার। তবে ফলাফলে বাংলাদেশই সবার উপরে অবস্থান করে। প্রতিযোগিতার একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর জানান, এই সাফল্য সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে সীমিত সম্পদ দিয়েও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হওয়া সম্ভব।