ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নামার বেশ কিছু দিন পরও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর কাছে প্রতিযোগিতাটি শেষ হয়নি। বরং তিনি এখন একটি নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, টুর্নামেন্ট চলাকালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত 'আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা' চালানো হয়েছে। সেই প্রচারণায় অর্থায়নের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সরকার—এমনটাই দাবি করেছেন এই কট্টর ডানপন্থী নেতা।

স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বঘোষিত উদারপন্থী মিলেই বলেন, ‘প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষেরা মুক্ত চিন্তাধারাকে সফল হতে দিতে চায় না বলেই এই প্রচারণা চালানো হয়েছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বাধীন ব্রাজিল সরকার সবচেয়ে বেশি অর্থ জুগিয়েছে এই অভিযানে। শুধু তাই নয়, গত শনিবার ব্রাজিলের মাটিতে দাঁড়িয়ে মিলেই ব্রাজিলকে সরাসরি দোষারোপ করেন। সেখানে তিনি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে ও আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারোর প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ওই ভাষণে তিনি লুলাকে ‘চোর’ ও ‘কয়েদি’ বলে আখ্যায়িত করেন, যা ব্রাজিল সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

মিলেইর এই বয়ান অবশ্য কিছু সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছেছে। বুয়েনস এইরেসের ৫২ বছর বয়সী বইবিক্রেতা পাবলো তোরেস, যিনি কখনো মিলেইকে ভোট দেননি, তিনিও স্বীকার করেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ‘আক্রমণাত্মক প্রচারণা’ তাকে ‘ক্ষুব্ধ’ ও ‘বিরক্ত’ করেছে। পাবলোর মতে, বর্ণবাদের যে অভিযোগ এসেছে, তা ‘সেই সব বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছ থেকে’ যারা ইতিহাসে দাসপ্রথা ও গণহত্যা চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আমাদের স্বকীয়তা ও ইতিহাসকে উপেক্ষা করেছে।’

টুর্নামেন্ট চলাকালে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থকের বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ফাইনালের কয়েক ঘণ্টা আগে হলিউড অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসন ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে আর্জেন্টিনাকে ‘পৃথিবীর অন্যতম বর্ণবাদী দেশ’ আখ্যা দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের ওই দলের পক্ষে উল্লাস না করার আহ্বান জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর্জেন্টিনার মতো সংগঠন দেশটিতে বর্ণবাদের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও ‘একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে বদ্ধমূল ধারণা পোষণের’ সমালোচনা করে।

মিলেই তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করেন, এসব সমালোচনার দায় আর্জেন্টিনার বিরোধী দলের ওপর বর্তায়, যারা ‘ওক আন্দোলনকে’ বৈধতা দিয়েছে। তবে ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী মার্সিডিজ মাসপেরো ২০ লাখের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, বিভিন্ন ভাষায় ‘জঘন্য মানুষ’ কথাটির পুনরাবৃত্তি হলেও একে সুসংগঠিত প্রচারণা বলা ‘বেশ কঠিন’। আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষক নাতালিয়া আরুগেতেও একমত যে ‘বৈরী আলোচনা’ থাকলেও বড় পরিসরে কোনো সুসংগঠিত প্রচার অভিযানের প্রমাণ নেই।

সমালোচকদের মতে, মিলেইর এই কৌশল ১৯৭৬-৮৩ সালের স্বৈরশাসনের সময়কার ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ ধারণার পুনরাবৃত্তি, যখন জান্তা সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনাকে একইভাবে উড়িয়ে দিত। আরুগেতে বলেন, মিলেই অনলাইন আলোচনাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত করে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘সংস্কৃতি যুদ্ধ’ চালাচ্ছেন, যখন তাঁর সরকার অভ্যন্তরীণভাবে অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও দুর্নীতি কেলেঙ্কারি তাঁর জনপ্রিয়তাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। এই বয়ান তাঁকে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে একটি বহিরাগত শত্রু সৃষ্টি করতে সাহায্য করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।