রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় বরং এর মূলে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতি। শহরকে রক্ষা করতে হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) আয়োজিত এক সেমিনারে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। 'বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা' শীর্ষক এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার নির্বাহী সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থা কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ, সেতু বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ওয়াসাসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাও এ তালিকায় রয়েছে।

ইকবাল হাবিবের মতে, একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি অংশগ্রহণমূলক নগর শাসনকে সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষ্য, ঢাকা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে দেশের অন্যান্য শহরের জন্যও একটি গণবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান সেমিনারে জানান, গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড বিবেচনা করে ড্রেনের নকশা করতে হবে। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী এ কাজ করার পরিকল্পনা চলছে। অধ্যাপক ও পানি গবেষক এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থার নতুন নকশা করা জরুরি। পাশাপাশি ওয়াসার পাম্পগুলো হালনাগাদ করারও প্রয়োজন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সিটি করপোরেশনগুলোর তুলনায় ওয়াসাকেই জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশি ভূমিকা রাখতে হয়।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেনের মতে, জলাবদ্ধতা কমাতে হলে ঢাকামুখী জনগণনা হ্রাস করতে হবে। এর জন্য রাজধানীর বাইরে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন তিনি। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক স্থপতি খুরশিদ জাবিন হোসেন অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মো. আনিছুর রহমান বলেন, দুর্যোগ ফিরে আসে যখন মানুষ তা ভুলে যায়। ড্রেনেজ সিস্টেম নিয়মিত হালনাগাদ করার ওপর জোর দেন তিনি। মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তুলে ধরে বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ভুক্তভোগী, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দেশের সব বড় শহরেই জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ও জনগণের সমন্বয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনার সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। তিনি জলাবদ্ধতা নিরসনে সাতটি সুপারিশ পেশ করেন। এগুলো হলো: কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন পেশাদার জনবল নিয়োগ; পুরো শহরকে পয়োবর্জ্য নেটওয়ার্কের আওতায় আনা; নদী, খাল, লেক, জলাভূমি ও নিষ্কাশন নালাকে একটি আন্তসংযোগ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা; দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ; বর্ষাকালে পাম্পনির্ভরতা কমিয়ে জলাধার-খালের সাথে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করা; সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা; এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রকৌশলগত বাস্তবভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করা।