রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনের প্যানেল আলোচনায় ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য: মানবাধিকার সুরক্ষায় টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্তের অভাব রয়েছে এবং বিচারকদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকলেও এর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। অভিযোগ কী এবং কীভাবে তদন্ত চলছে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানতে পারে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তুতকৃত মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া বর্তমান সরকারের আমলে পরিবর্তন করে দুর্বল করা হয়েছে—এমন একটি প্রশ্নের জবাবে সারা হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি কার্যকর কমিশন গঠনের সুযোগ ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমান খসড়াটি ২০০৯ সালের আইনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী এবং এটি দুর্বল হওয়া মানে পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে, তা ভাবার কারণ নেই।
প্যানেল আলোচনায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালী দয়ারত্নে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়োগ, বাজেট, জনবল নির্বাচন ও কার্যক্রম পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। কেবল আইনি ক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচন চালু করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, একটি শক্তিশালী আইন প্রয়োজন যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের বাইরে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবি জানানো ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভুক্তভোগীদের এই প্রক্রিয়ার অংশ করে তোলা বর্তমান দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সরাসরি অন্যায়ের শিকার ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত হয়, তখন সেগুলো আরও শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে বলে তিনি যুক্তি দেন। ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার ও ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের খসড়া আইনে নিরাপত্তা বাহিনীকে কীভাবে দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরেন। আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো জরুরি। তিনি জানান, সরকার, বিরোধী দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন নিয়োগকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ার্স দিপেক এলমার বলেন, একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন ক্ষমতাসীন, বিরোধী দল ও জনগণ—সবার স্বার্থেই কাজ করবে। প্যানেল আলোচনাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান।




