দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। শনিবার (২৫ জুলাই) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণা কেন্দ্রটি জানায়, এসব ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত রোগীদের মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি।

আইসিডিডিআরবির দুটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রথম গবেষণাটি রাজধানীর একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে করা হয়েছে। দেখা গেছে, ভর্তির সময় যাদের শরীরে এসব ব্যাকটেরিয়া ছিল না, তাদের ৫৩ শতাংশ চিকিৎসাধীন অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছেন।

দ্বিতীয় গবেষণাটি একই হাসপাতালের নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি ৩৬৩ নবজাতকের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। গবেষণা দুটির ফলাফল আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ ও ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোলে’ প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাসপাতালে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য প্রধানত চারটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া দায়ী: ই-কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি ও সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে এবং মারাত্মক সংক্রমণ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

গবেষকদের মতে, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় নতুন করে এসব ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হচ্ছেন। আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশের অন্ত্রে এসব ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কলোনাইজেশন’ বলা হয়। এই অবস্থায় রোগী নিজে অসুস্থ না-ও হতে পারেন, তবে তার শরীর থেকে জীবাণু অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ভর্তির সময় যেসব ১৯৮ জন রোগীর শরীরে এসব ব্যাকটেরিয়া ছিল না, তাদের মধ্যে ১০৫ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে সংক্রমিত হন। হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, শরীরে নীরবে থাকা এসব ব্যাকটেরিয়া পরে কীভাবে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নিতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, আইসিইউতে রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ল্যাব পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ও সংক্রমণে রূপান্তর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

আইসিডিডিআরবির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার মুখ্য গবেষক ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল আরোগ্যের জায়গা হওয়া উচিত, নতুন সংক্রমণের উৎস নয়। সংকটাপন্ন রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার আরও জোরদার করা জরুরি।