গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস–সংকট এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এত দিন উৎপাদন সচল রাখতে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছিলেন শিল্পকারখানার মালিকেরা। কোথাও কিছু উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখা, কোথাও মেশিনের সংখ্যা কমিয়ে চালানো, আবার কোথাও রাতের শিফটে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এবার যোগ হলো সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে টানা ছুটি ঘোষণা। শিল্পমালিক, শিল্প পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বুধবার শুরু হওয়া এই ছুটিতে শত শত পোশাকশ্রমিক গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়, কোনাবাড়ী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগাড়াসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়ক ও পরিবহন কাউন্টারে শ্রমিকদের ভিড় বাড়তে দেখা গেছে। অনেকেই এ সুযোগে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোয় যাত্রীর চাপ বেড়েছে।

আজ সকাল নয়টায় চন্দ্রা এলাকায় কথা হয় গোমতী টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক কফিল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, কাজ না থাকলে কারখানায় বসে থাকার চেয়ে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যেতে পারাটা ভালো। তবে দ্রুত গ্যাস–সংকটের সমাধান হোক এবং কারখানাগুলো আবার পুরোপুরি চালু হোক। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, ‘এক দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে যোগ করে জেলার অনেক কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০ শতাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন।’

কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক জাফর আলী জানান, জেলার অনেক কারখানায় সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে চার দিনের ছুটি দিয়েছে। এই ছুটি পেয়ে শ্রমিকেরা গ্রামের পথে ছুটে যাচ্ছেন। যার কারণে গত রাত থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহনের বেশ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আজ সকালেও চন্দ্রা এলাকায় শত শত মানুষ ও যানবাহনের ভিড়ে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করছে।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে যেসব শিল্পকারখানা চার দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে, এসব কারখানার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনেক কারখানাই উৎপাদন সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজীপুর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। এখানে কয়েক হাজার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা রয়েছে।

গাজীপুরের ভোগড়া চৌরাস্তায় এলাকার স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও তরুণ শিল্পউদ্যোক্তা মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘অব্যাহত গ্যাস–সংকটের কারণে দিন দিন অর্ডার কমে যাচ্ছে। ক্রেতারা দেখছেন, এই সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকলে এ শিল্প ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। গ্যাসের সমস্যার কারণে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে কর্মীদের চার দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। আশা করি, সরকার এই সময়ে গ্যাসের সমস্যা সমাধান করবে।’

গাজীপুর তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, জেলায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো। গ্যাস–সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় কাজ চলমান রয়েছে।

কোনাবাড়ী এলাকার পিএন কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপক তাপস পাল বলেন, গ্যাস–সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।