বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, দেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্য প্রথমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেছেন, রাজনীতি সঠিক পথে না এগোলে অর্থনীতির সংস্কার সম্ভব নয়। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার তাকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ফোন করে জানিয়েছিলেন, এবার তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। আহসান মনসুর জানান, শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও তাকে এ পদে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তখন তিনি রাজি হননি। কারণ, সে সময় তিনি মনে করেছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নেই। তিনি আরও জানান, ফজলে কবিরের দ্বিতীয় মেয়াদের আগে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি না করায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে ফজলে কবিরের জন্য বয়সসীমা বাড়ানো হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাইরে থেকে যতটা খারাপ মনে করেছিলেন, বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল। সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণ অন্তত আড়াই গুণ বেশি হবে বলে তার ধারণা ছিল। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা যায় তা ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদেশি পরিশোধের বকেয়া। ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণপত্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ করা হয়নি। বিদ্যুৎ খাতের বিলও বকেয়া ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণসুবিধা কমিয়ে দিতে শুরু করেছিল এবং কেউ কেউ বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা না করার হুমকি দিয়েছিল।
তার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, কারণ বিনিময় হার ৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়ে গিয়েছিল। তিনি মনে করতেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল না করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আর কমতে না দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। এছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪টি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নীতিগত দিকেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নীতিসুদ (পলিসি রেট) ৮.৫% থেকে বাড়িয়ে ১০% করা।
তবে মূল্যস্ফীতি জুনের মধ্যে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তার দায়িত্বের সময় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে ছিল। বিনিময় হার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তার বিতর্ক হয়েছিল। আইএমএফ চাচ্ছিল বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করে দিতে, কিন্তু তিনি মনে করতেন, বাজারে যখন আতঙ্ক ও বিপুল বকেয়া দায় রয়েছে, তখন তা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতনকাঠামো অনেক কম, যা মেধাবীদের আকর্ষণ করতে পারে না এবং দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ায়। তিনি গভর্নর পদকে মন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, যা বর্তমানে নেই। তার নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে আমানত বিমা সুরক্ষা আইন, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ আইন, এবং পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের একীভূতকরণ। তিনি অর্থঋণ আদালত অধ্যাদেশ ও সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের (ডামা) খসড়া তৈরি করে গেছেন।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান পরিসংখ্যান প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে ৩-৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন, এবং তার সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে কোনো চাপ আসেনি বলে জানান।
আগের সময়ের লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল এবং ১২টি যৌথ তদন্ত দল কাজ করছিল। বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকার এ কাজে সহায়তা করেছিল। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
বর্তমান অর্থনীতির তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আইন বাস্তবায়ন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উঠিয়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে এবং সরকারের আকার কমাতে হবে।
সরকার পরিবর্তনের পর তাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি কোনো ইঙ্গিত পাননি। দুই দিন আগেও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তার কিছু আসে যায়নি, কারণ তিনি দেড় বছরে অনেক কিছু করতে পেরেছেন। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করেছেন, রিজার্ভ ২০ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে এসেছেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল করেছেন এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে এনেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করলে আগামী পাঁচ-সাত বছরে জনপ্রিয়তা পাবে।



