দীর্ঘদিনের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকিং খাতে নারী গ্রাহকদের অংশগ্রহণ সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত মার্চ মাসে নারীদের ব্যাংক আমানত ও ঋণ গ্রহণ—দুটো ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ধারা দেখা দিয়েছে। এর ফলে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যক্তিশ্রেণির গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যাংক আমানতের ৫৬ শতাংশ। গত মার্চ শেষে ব্যক্তি আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজার, যেখানে নারী গ্রাহকদের হিসাবের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগে ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ব্যক্তিশ্রেণির মোট আমানতের মধ্যে নারীদের অংশ ডিসেম্বরে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ থাকলেও মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে। অন্যদিকে ঋণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। মার্চ শেষে মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার হলেও নারীদের অংশ কমে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যক্তিশ্রেণির ঋণের পরিমাণ ডিসেম্বরের ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে মার্চে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা হলেও নারীদের ঋণের অংশ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, নারীদের আমানত কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো জরুরি খরচ মেটাতে নারী গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীরা তাদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। রাজধানী উত্তরার বাসিন্দা ও গৃহিণী মাহফুজা আক্তারের মতো অনেকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এতে করে তাঁরা সাময়িকভাবে স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ঋণ গ্রহণ কমে যাওয়ার অর্থ হলো নারীরা নতুন করে কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা শুরু করছেন না।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য অর্থনীতির মন্দা ও ব্যাংকগুলোর নারী-বান্ধব ঋণ নীতির অভাবকে দায়ী করছেন। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী মনে করেন, বর্তমানে পুরো ব্যাংক খাত চাপের মধ্যে রয়েছে, যার প্রভাব প্রান্তিক পর্যায়ে পড়েছে এবং নারীরা এর সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, নারীদের এগিয়ে রাখতে প্রচার, প্রণোদনা ও বিশেষ তদারকির মতো নানামুখী উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ায় নারীরা ঋণের জন্য ব্যাংকে আসছেন কম। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোরও নারীদের ঋণ দিতে আগ্রহ কম। অনেক ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকায় নারীদের ঋণে অংশগ্রহণ আরও হ্রাস পেয়েছে।




