মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি আমেরিকান উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো কিছু কোম্পানিকে পুনরায় চীনে ফিরে যেতে বাধ্য করছে বলে জানা গেছে। টেক্সাসভিত্তিক ফ্ল্যাশলাইট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স কনজিউমার গ্রুপ এর একটি উদাহরণ। গত বছর চীনের ওপর মার্কিন শুল্ক ব্যাপকভাবে বাড়লে কোম্পানিটি তার পণ্যের জন্য থাইল্যান্ডে একটি কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করেছিল তার চীনা সরবরাহকারীকে। কিন্তু বর্তমানে চীনা পণ্যের ওপর শুল্কের হার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো অন্যান্য দেশের সমানে নেমে আসায় কোম্পানিটি পুনরায় চীন থেকে পণ্য উৎপাদন ও আমদানির কথা ভাবছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ফিল লাস্টার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তারা আবার চীনে ফিরে এসেছেন। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ মেরি লাভলির মতে, এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। শুল্কের কারণে কত মার্কিন কোম্পানি চীনা সরবরাহকারীদের কাছে ফিরছে তার পরিমাণগত তথ্য এখনও না থাকলেও, এই প্রবণতা অর্থপূর্ণ বলেই মনে করেন তিনি। ফরচুনকে তিনি বলেন, ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক বাতিল হওয়ায় চীন ও অন্যান্য দেশের মধ্যে শুল্কের পার্থক্য কমে আসায় এই প্রবণতা যৌক্তিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করলেও, গত এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে’তে নির্ধারিত ১৪৫ শতাংশ শুল্কের তুলনায় তা অনেক কমেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সেকশন ৩০১ শুল্কের আওতায় চীন ও ভিয়েতনামের জন্য প্রায় ১২.৫ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য ১০ শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক অন্যদেশগুলোর তুলনায় চীনের সস্তা পণ্য রপ্তানির সুবিধা কার্যত কমিয়ে দিলেও, ভোগ্যপণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে চীনের ওপর মার্কিন নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এই শুল্ক কতটা কার্যকর হয়েছে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনে ফিরে আসা মার্কিন কোম্পানিগুলোর এই ধারা একটি বৃহত্তর ঘটনার ইঙ্গিত দেয় যা সহসা সমাধান হবে না: বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে জড়িত, এবং ট্রাম্পের উৎপাদন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা সম্ভবত কল্পনাই থেকে যাবে। লাভলি বলেন, ‘উৎপাদন ফিরিয়ে আনার গল্পটা আসলেই গল্প নয়। উৎপাদন ফিরে আসছে না।’ গত বছরের এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯ হাজারটি উৎপাদনমূলক চাকরি কমেছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পর চীনা আমদানির হার কমলেও, এই তথ্য পুরো চিত্র তুলে ধরে না বলে মত লাভলির। পিটারসন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মার্কিন আমদানিতে চীনের অংশ ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ১১ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে মার্কিন আমদানির মোট সংযোজিত মূল্যে চীনের অংশ ১৫ শতাংশের কাছাকাছি অপরিবর্তিত রয়েছে। লাভলির মতে, এক দশকেরও কম সময়ে চীনা আমদানির অংশ কমানো অবাস্তব। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ব্যাখ্যা করেন, একটি প্রযুক্তি কোম্পানি শুল্ক এড়াতে ভারতে উৎপাদন বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই ভারতীয় কারখানাটি তার উপকরণ চীন থেকেই সংগ্রহ করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটা বিশ্বাস করা কঠিন, আসলে বিশ্বাস করা বোকামি, কারণ যা ঘটছে তা হলো এই উপকরণগুলো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যাচ্ছে। শীর্ষস্থানীয় সংখ্যাগুলো যতটা ইঙ্গিত দেয়, তার চেয়ে অনেক কম বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে।’ এমনকি যদি যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দেন যে এর খরচ নিষিদ্ধমূলক হবে। ইওয়াই-পার্থেননের হিসাব অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কার্যকরভাবে বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী ২৫ বছরে ১৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এই খরচের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং কর্মশক্তি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নির্ভরশীলতা বিশ্বায়নের একটি স্বাভাবিক ফল হিসেবে গড়ে উঠেছে, কিন্তু সস্তা শ্রম ও উৎপাদন খরচের কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনের ওপর নির্ভরশীল থাকায় তা আরও তীব্র হয়েছে। ইওয়াই-পার্থেননের ম্যাক্রো ও ভূ-কৌশল বিষয়ক প্রধান ম্যাটস পার্সন ফরচুনকে বলেন, ‘আপনার কাছে এই দুটি শক্তির মধ্যে একটি গতিশীলতা ও দ্বান্দ্বিকতা রয়েছে, যা বিভিন্নভাবে শত শত বছর ধরে বিদ্যমান, কিন্তু এখন তা অত্যন্ত প্রকট।’ লাভলির মতে, চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের বাইরেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে—যার মধ্যে দেশীয়ভাবে বিরল মৃত্তিকা পরিশোধনকারী সম্প্রসারণ এবং বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে বিদেশি প্রভাবের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির আইন প্রস্তাব করা অন্তর্ভুক্ত—তবে শিল্প সরবরাহের মতো কিছু পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে কিনতে থাকবে। তিনি মনে করেন, এখানেই যুক্তরাষ্ট্র একটি কঠিন অবস্থানে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিতে এবং যেসব পণ্য দেশেই তৈরি করা সম্ভব সেগুলোর ওপর কর আরোপ করতে পারলেও, উৎপাদন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সম্ভবত বাইডেন প্রশাসনের চিপস অ্যাক্টের মতো ভর্তুকিও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা ক্রমবর্ধমান মার্কিন ঋণের কারণে সম্ভব নয়। লাভলি বলেন, ‘শুল্ক সম্ভবত যেকোনো গুরুতর নীতি প্যাকেজের অংশ হবে। কিন্তু এটি একমাত্র উপায় হতে পারে না।'
ট্রাম্পের শুল্কনীতির উল্টো ফল: চীন থেকে ফিরছে মার্কিন কোম্পানি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি আমেরিকান উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে কিছু কোম্পানিকে পুনরায় চীনে ফিরে যেতে বাধ্য করছে। শুল্কের পার্থক্য কমে যাওয়ায় এবং চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কাটানো অসম্ভব প্রায় হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।



