বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে আর্জেন্টিনা শোকের মাতমে ডুবে গেছে। লিওনেল মেসি ও তাঁর সতীর্থদের হাতে দেখা গেছে কালো বাহুবন্ধনী, যা আন্তোনিও রাতিনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর নিদর্শন। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) নিশ্চিত করেছে, বিশ্বকাপের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ শুরুর কিছুক্ষণ আগে ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার।

রাতিনের পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি একনিষ্ঠভাবে খেলেছেন বোকা জুনিয়র্সের হয়ে, প্রায় পনেরো বছর ধরে। জাতীয় দলের হয়েও তিনি দশ বছর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে একটি বিশেষ কারণে। ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ডের প্রচলনের সূত্রপাত ঘটেছিল তাঁর একটি ঘটনা থেকে।

১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাতিন। ১৯৬৬ সালের আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিই তাঁকে অমর করে রেখেছে। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে একটি ফাউলের প্রতিবাদ করায় জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন তাঁকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। সে সময় রেফারিরা কোনো কার্ড ব্যবহার করতেন না, মৌখিকভাবেই খেলোয়াড়দের সতর্ক বা বহিষ্কার করতেন।

প্রথমে রাতিন মাঠ ছাড়তে রাজি হননি। তাঁর দাবি ছিল, রেফারির ভাষা স্প্যানিশ না হওয়ায় তিনি কী বলছেন তা বুঝতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়ার সময় তিনি এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদ করেন। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে রাতিন নিজেই সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মাঠের কোণায় পৌঁছে আমি ইংল্যান্ডের পতাকা মুচড়ে ফেলি এবং তাদের গালি দিই। তারপর রানি যে লাল গালিচা দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেন, সেটির ওপর গিয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট বসে থাকি। গালিচাটি সত্যিই অসাধারণ ছিল।’

এই ঘটনার পর ফিফা উদ্যোগী হয় খেলোয়াড় ও রেফারিদের মধ্যে ভাষাগত যোগাযোগ সমস্যা দূর করতে। ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান কেনেথ জর্জ অ্যাস্টন ট্রাফিক লাইটের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬৭ সালে হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবস্থা চালু করেন। বিশ্বকাপে এই ব্যবস্থা প্রথম কার্যকর হয় ১৯৭০ সালে।

শুধু কার্ড ব্যবস্থাই নয়, ওয়েম্বলির সেই ঘটনা ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফুটবলীয় শত্রুতারও সূচনা করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এই দ্বন্দ্বকে আরও উস্কে দেয়।

আজকের দিনে রাতিনের বিদায় এমন এক সময়ে ঘটল, যখন আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামছে। সুইজারল্যান্ডকে হারাতে পারলে শেষ চারে তাঁদের প্রতিপক্ষ হবে সেই ইংল্যান্ডই, যে দেশের বিপক্ষে রাতিনের বিতর্কিত ঘটনা ফুটবলের নিয়মকানুন বদলে দিয়েছিল।