যুক্তরাষ্ট্রের ছোট শহর কানসাস সিটি বর্তমানে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে 'আমেরিকার ফুটবল রাজধানী' থেকে 'বিশ্বের ফুটবল রাজধানী' হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। মেট্রো এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ, যা ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শহরটি তার চিফস ও বারবিকিউর জন্য বেশি পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বকাপই তাদের প্রধান পরিচয়।
শিকাগো যখন ফিফার অতিরিক্ত শর্ত ও চুক্তির জটিলতার কারণে বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন কানসাস সিটি এই সুযোগ লুফে নেয়। কানসাস সিটি এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও সিইও টিম কাউডেন বলেন, শিকাগোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের না করার কারণেই আমাদের জন্য এই সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপের জন্য শিকাগোর তেমন প্রয়োজন নেই, কিন্তু কানসাস সিটি এই সুযোগকে হাতছাড়া করেনি।
শহরটি গত দেড় দশকে ফুটবল পরিকাঠামোতে প্রায় ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। স্পোর্টিং কেসির ঘরোয়া মাঠ চিলড্রেন্স মার্সি পার্ক ২০১১ সালে চালু হয়, যা মেজর লিগ সকারের অন্যতম সেরা ফুটবল-নির্দিষ্ট স্টেডিয়াম। কানসাস সিটি কারেন্টের CPKC স্টেডিয়াম ২০২৪ সালে চালু হয়, যা বিশ্বের প্রথম উদ্দেশ্য-নির্মিত পেশাদার নারী ফুটবল স্টেডিয়াম। নেদারল্যান্ডস দলকে বেস ক্যাম্পের সুবিধা দিতে কারেন্ট আরও ৫২ কোটি ডলার ব্যয় করে অতিরিক্ত একটি সুবিধা ও ২ হাজার আসনের স্টেডিয়াম নির্মাণ করে।
বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড কানসাস সিটিকে তাদের বেস ক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বলেন, তাদের ফ্যাসিলিটি চমৎকার এবং সবাই স্বাগতপূর্ণ আচরণ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, কানসাস সিটি তাদের কাছে 'বাড়ির মতো' মনে হয়েছে। ফিফার অফিসিয়াল ক্যাটালগে না থাকা সোয়োপ সকার ভিলেজ তাদের প্রশিক্ষণ স্থান হিসেবে অনুরোধ করেছিল ইংল্যান্ড।
পরিবহন চ্যালেঞ্জ ছিল অন্যতম বড় বাধা। স্টেডিয়ামে কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। দুই রাজ্য, ১৮ কাউন্টি ও ৫০টির বেশি কমিউনিটি জুড়ে বিস্তৃত এই শহরে চারটি বেস ক্যাম্প দলের জন্য প্রতিদিন ২০টির বেশি যানবাহন এসকর্ট পরিচালনা করতে হয়। এই সমস্যা সমাধানে কেসি২০২৬ জয়েন্ট অপারেশন সেন্টার (জেওসি) গঠন করে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবহন সমন্বয়কারী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন। জেওসির মাধ্যমে রিয়েল টাইমে যানবাহন রুট পরিবর্তন ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কেসি২০২৬-এর সিইও পাম ক্রেমার বলেন, প্রথম ম্যাচে ভিড় হলেও দ্বিতীয় ম্যাচের আগে ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে গেট খোলার সময় ও পরিবর্তন আনা হয়, ফলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।
বিশ্বকাপ থেকে কানসাস সিটি সরাসরি টিকিট বা পার্কিং আয় পাচ্ছে না। ফিফা এই টুর্নামেন্ট থেকে প্রায় ৮৯০ কোটি ডলার আয় করবে, কিন্তু আয়োজক শহরগুলোকে মিলিয়ে ২৫০ কোটি ডলারের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কানসাস সিটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই ফিসার্ভ ও পানাসনিকের মতো প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করছে। কাউডেনের মতে, বিশ্বকাপ 'রকেট ফুয়েল' হিসেবে কাজ করছে, যা শহরের অর্থনীতিকে আরও চাঙা করছে। তিনি বলেন, সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব ৬৫০ কোটি ডলার হতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের অনুভূতি ও গর্ব।
স্থানীয় ফুটবলার ম্যাট বেসলার, যিনি স্পোর্টিং কেসির হয়ে প্রায় ৩০০ ম্যাচ খেলেছেন, তিনি শৈশবে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এখন তার সন্তানরা নিজ শহরে বিশ্বকাপ দেখছে। তিনি বলেন, ফুটবল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যায় এবং পরিবারের অংশ হয়ে যায়।
বিশ্বকাপ শেষ হলেও কানসাস সিটির জন্য এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। নতুন বাস নেটওয়ার্ক 'কানেক্ট কেসি ২৬' ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে, যা শহরের বিভিন্ন অংশে সরাসরি পরিষেবা দিচ্ছে। এছাড়া স্ট্রিটকার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। কেসি২০২৬-এর বোর্ড সভাপতি মার্ক জর্জেনসেন বলেন, বিশ্বকাপকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচন করা হচ্ছে।
ক্রমার বলেন, সংশয় থাকলেও এখন সবাই দেখছে যে এটি বাস্তব এবং আমরা তা করতে সক্ষম। তিনি মনে করেন, মেমোরি তৈরির জন্যই এই আয়োজন, যা কানসাস সিটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে দেবে।




