ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার একটি বিল আইনে পরিণত হওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সোমবার জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের সদস্যদের মধ্যে এক সমঝোতা বৈঠকে সংশোধিত বিলটির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করা হয়। মঙ্গলবার উভয় কক্ষে চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশ হলেই আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এই আইন কার্যকর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। আগামী বছর তার পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে, এটি তার নেতৃত্বে গৃহীত শেষ বড় নীতি নির্ধারণী পদক্ষেপগুলির একটি বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিলটিতে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের পাশাপাশি উচ্চ বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মূল বিরোধ ছিল নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মের পরিধি নিয়ে। জাতীয় পরিষদ সব ধরনের অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্কিং পরিষেবা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিল, অন্যদিকে সিনেট শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের একটি তালিকা তৈরি করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় কমিশনের মতামত ও ইইউ আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অনলাইন বিশ্বকোষ, শিক্ষামূলক বা বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা এবং ওপেন সোর্স সফটওয়্যার বিকাশ ও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
বিলটি ইইউ ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা অনলাইনে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর শর্ত আরোপ করে। ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য মনে করেছিল যে প্রস্তাবিত আইনটি ইইউ আইনের সাথে ওভারল্যাপ করছে এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষকে খসড়াটি সংশোধন করতে বলে। সংশোধিত সংস্করণটি সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও আইনপ্রণেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। আইনটি মঙ্গলবার গৃহীত হলে ইইউ আইনের নোটিফিকেশন সময়কালের কারণে এটি ১০ আগস্টের আগে কার্যকর করা সম্ভব হবে না।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, প্রতি দুই কিশোরের মধ্যে একজন প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্মার্টফোনে সময় ব্যয় করে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করে এবং তাদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। প্রতিবেদনে সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব যেমন আত্মসম্মান হ্রাস, আত্ম-ক্ষতিকর আচরণ, মাদক সেবন ও আত্মহত্যার মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফ্রান্সে একাধিক পরিবার টিকটকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, যেখানে তারা ক্ষতিকর কন্টেন্টের কারণে তাদের কিশোর সন্তানদের আত্মহত্যার জন্য প্ল্যাটফর্মটিকে দায়ী করেছে।
শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী ব্যাপকতা লাভ করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন সম্প্রতি শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সীমা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। একটি বিশেষ ইইউ প্যানেল ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে, যতক্ষণ না প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা প্রমাণ করে। ভন ডের লেয়েন তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সম্পূর্ণরূপে স্ক্রিন ব্যবহার এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এবং অসীম স্ক্রোলিংয়ের মতো আসক্তিমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ টিকটক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ১৫ বা ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপীয় কমিশন শিগগিরই ২৭ সদস্য দেশের জন্য একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।




