বাংলাদেশে ইয়াবা—থাই ভাষায় যার অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’—একটি ভয়াবহ মহামারির রূপ নিয়েছে। ধারণা করা হয়, লাখ লাখ মানুষ এই মাদকে আসক্ত, এবং সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক সেবনকারীদের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।

একজন আসক্ত ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ‘মেটালফ্রিক’ বলে পরিচয় দিতে চেয়েছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, একসময় তিনি তাঁর পোষা পাখির যত্ন নিতেন, কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। তিনি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ওপর ইয়াবার বড়ি রেখে তাপ দিয়ে ধোঁয়া টানেন। প্রতিটি কমলা রঙের বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এরপর তিনি টানা তিন দিন জেগে থেকে চরম ক্লান্তিতে ১২ ঘণ্টার বেশি ঘুমান। তিনি বলেন, ‘এই জিনিসটা আমার মনমানসিকতা একেবারে শেষ করে দিয়েছে’ এবং এটি ‘মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়’।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানান, বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার কমাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি জরুরি। তাঁর মতে, সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ আছেন, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো চিকিৎসাই নেন না। তিনি মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে মত দেন।

ডা. আরিফুজ্জামান আরও বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন ‘খুবই সাধারণ’ বিষয়। অনেক ব্যবহারকারী বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়ির মতো অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করে। তবে ইয়াবার ব্যবহার ‘উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে’। কিছু ব্যবহারকারী মাদক নেওয়ার পরও কর্মক্ষম থাকেন, কিন্তু ‘মস্তিষ্কের দুর্বলতার’ কারণে অনেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও কোভিড-১৯-এর মতো সংকট পরিস্থিতি আসক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক আসক্ত ব্যক্তি মাদকের খরচ জোগাতে নিজেরাই ডিলার হয়ে যান, আবার কেউ কেউ বিষণ্নতা বা উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

মিয়ানমার থেকে অধিকাংশ ইয়াবা বাংলাদেশে আসে বলে ধারণা করা হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। তবে আরও অনেক বেশি মাদক বাজারে চলে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছিল। ফিলিপাইনের মাদকবিরোধী যুদ্ধের আদলে চালানো সেই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, যা দেশের দরিদ্র এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদ মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করেছে।

মেটালফ্রিক জানান, ইয়াবা সেবনের কারণে তিনি অনেক বন্ধু হারিয়েছেন। এটি নিয়মিত সেবনে স্ট্রোক, দাঁত হারানো ও খিঁচুনির মতো সমস্যা দেখা দেয়। তিনি বলেন, ‘এই জিনিসটা মানুষকে মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দেয়’ এবং ব্যবহারকারীরা ‘অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ ও মাদকাসক্তিকে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত... আমার নিজের একটা ঘর আছে। আমি চাইলে সেখানে শুয়ে থাকতে পারি।’ তবে তিনি ইয়াবা সেবনকারীদের ‘দুই বছরও টিকতে না পারার’ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।