পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কাজ করেন অসংখ্য বাংলাদেশি শেফ। নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কঠোর শ্রম দিয়ে তারা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছেন আন্তর্জাতিক মানের রান্নায় তারা কম যান না। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা এশিয়ার নানা প্রান্তে আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোতে তাদের কাজের স্বীকৃতিও মিলছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই সাফল্যের মাঝেও কোথায় হারিয়ে গেল বাংলাদেশের নিজস্ব রন্ধনশৈলী? বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে কর্মরত এক বাংলাদেশি শেফের চোখে এই বাস্তবতা উঠে এসেছে এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে।

গত কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের অধীন লো মেরিডিয়েন, শেরাটন, সেন্ট রেজিসের মতো বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। সেখানে প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য তৈরি করতে হয়েছে নানা দেশের খাবার। ইতালিয়ান, ফরাসি, জাপানিজ, চায়নিজ, থাই, ভারতীয়, মেক্সিকান কিংবা আরবীয়—একই হোটেলের আ লা কার্ট মেনু বা আন্তর্জাতিক বুফেতে দেখা গেছে বিশ্বের অসংখ্য দেশের রন্ধনপ্রণালীর পদ। কিন্তু একটি দেশের খাবার প্রায় কখনোই সে তালিকায় চোখে পড়েনি। সেই দেশটি বাংলাদেশ। এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন শেফ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত হতাশাই নয়, গোটা বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পের জন্য এটি একটি বড় করুণ বাস্তবতাও বটে।

বাংলাদেশের রান্না কি কম সুস্বাদু? একদমই নয়। ঐতিহ্যবাহী রেসিপির সংখ্যাও কম নয়। সিলেটের সাতকরা থেকে শুরু করে ঢাকার কাচ্চি, চট্টগ্রামের মেজবান, বরিশালের ঐতিহ্যবাহী পদ, খুলনার চিংড়ি, রাজশাহীর আঞ্চলিক রান্না কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রন্ধনঐতিহ্য বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ। ভর্তা, ভুনা, মাছ, মাংস, পিঠা, মিষ্টি কিংবা মসলার অনন্য ব্যবহার, নদীমাতৃক খাদ্যাভ্যাস—সবই যেন এক অমূল্য ভান্ডার। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা খাবারের স্বাদে নয়, বরং উপস্থাপনায় এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি খাবারকে পরিচিত করানোর কৌশলগত ঘাটতিতে।

বিশ্বের প্রতিটি বড় শহরে আজ খুঁজে পাওয়া যায় ভারতীয়, চায়নিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ান কিংবা ফরাসি রেস্তোরাঁ। এই খাবারগুলো শুধু জনপ্রিয়ই নয়, হয়ে উঠেছে একটি বিশাল বৈশ্বিক শিল্প। ফলে এসব রন্ধনপ্রণালীতে দক্ষ শেফদের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে সবসময়ই থাকে। হোটেল, রিসোর্ট কিংবা রেস্তোরাঁগুলো নিয়মিতভাবে এই সব কুইজিনের শেফ নিয়োগ দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশি শেফদের একটা বড় অংশ আন্তর্জাতিক রান্নাঘরে কাজ করলেও তাদের অধিকাংশকেই রান্না করতে হয় অন্য দেশের খাবার। নিজ দেশের কুইজিন নিয়ে কাজ করার সুযোগ তারা খুব কমই পান। এর মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি খাবারের এখনো একটি শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠেনি।

যদি সঠিক গবেষণা, আধুনিক উপস্থাপনা, মানসম্মত রেসিপি স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন এবং কার্যকর প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশি কুইজিনকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এর জন্য তৈরি হবে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার। উপকৃত হবে একটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন শিল্প এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ও। এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছেন ওই শেফ। তাঁর কাছে এটি শুধু স্বপ্ন নয়, একটি যুদ্ধ। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি তিনি চান নতুন প্রজন্মের শেফরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করুক এবং নিজেদের শিকড়কেও ভুলে না যাক। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কালিনারি শিক্ষা, ফুড সায়েন্স, কিচেন ম্যানেজমেন্ট, মেনু ইঞ্জিনিয়ারিং, ফুড কস্টিং, আন্তর্জাতিক মান এবং বাংলাদেশি কুইজিন নিয়ে তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করছেন।

একটি দেশের কুইজিন বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয় শুধু সুস্বাদু খাবারের মাধ্যমেই নয়। প্রয়োজন গবেষণা, ডকুমেন্টেশন, স্ট্যান্ডার্ড রেসিপি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, দক্ষ শেফ, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব খাদ্য ঐতিহ্য রয়েছে। সেগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ ও আধুনিকভাবে পরিবেশন করতে পারলে একদিন বিশ্বের পাঁচ তারকা হোটেলের বুফেতেও স্থান পাবে বাংলাদেশি খাবার। সেই দিনের প্রতীক্ষায় তিনি রয়েছেন, যেদিন বিদেশের কোনো বিলাসবহুল হোটেলে গিয়ে কোনো অতিথি গর্ব করে বলবেন, 'আজ আমি বাংলাদেশি খাবার খেতে চাই।' সেদিন শুধু একটি খাবারের স্বীকৃতিই হবে না, স্বীকৃতি পাবে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, মসলা, নদী এবং হাজার বছরের খাদ্য ঐতিহ্য। এই পরিবর্তন সম্ভব বলেই তাঁর বিশ্বাস। যদি দেশের শেফ, রেস্টুরেন্ট, কালিনারি ইনস্টিটিউট, গবেষক, উদ্যোক্তা, সরকার ও খাদ্যপ্রেমীরা একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশি কুইজিন বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রাপ্য সম্মান অর্জন করবে।