ব্যবসা বা করপোরেট জগতের প্রতি আগ্রহ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময় আইবিএ হতে পারে সবার প্রথম পছন্দ। তবে আইবিএর প্রস্তুতি একেবারে ভিন্ন ধরনের; এখানে মুখস্থ করে ভালো ফল করার সুযোগ সীমিত। ইংরেজি, গণিত, যুক্তি এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা—এই চারটি বিষয়েই দখল থাকা আবশ্যক। মজার বিষয় হলো, আইবিএতে পড়তে বাণিজ্য বিভাগ থেকে আসতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; বরং বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই এখানে বেশি। তাই বিভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে প্রস্তুতি শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা মূলত তিনটি বিষয়ে হয়—ইংরেজি, গণিত ও অ্যানালিটিক্যাল বা বিশ্লেষণী দক্ষতা। অন্য অনেক ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে এর মিল কম। আসনসংখ্যা মাত্র ১২০, ফলে শুরু থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—‘পারব তো?’ কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভয় পাওয়ার চেয়ে একবার চেষ্টা করে দেখা ভালো। প্রস্তুতি শুরুর আগে একটি কাজ করতেই বলব—আগের বছরের কোনো প্রশ্ন নিয়ে সময় ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দিন। নেতিবাচক নম্বরের হিসাবও রাখবেন। এরপর দেখুন, তিনটি বিভাগের মধ্যে কোথায় আপনার অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল; সেখান থেকেই শুরু করুন। কারণ, আইবিএর পরীক্ষায় তিনটি বিষয়েই আলাদাভাবে ভালো করতে হয়। গণিতে অসাধারণ নম্বর পেলেও ইংরেজি বা বিশ্লেষণী দক্ষতা খারাপ হলে কোনো লাভ নেই।
গণিতে মূলত বীজগণিত ও জ্যামিতির মতো বিষয় আসে, তবে প্রশ্নগুলো তুলনামূলক কঠিন। এখানে ক্যালকুলেটর ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাই দ্রুত গুণ-ভাগ, মাথায় হিসাব করার অভ্যাস এবং সময় বাঁচানোর কৌশল অত্যন্ত কাজে দেয়। ইংরেজিতে গ্রামারের খুঁটিনাটি জানার পাশাপাশি শব্দভান্ডার বাড়ানো জরুরি; শুধু বইয়ের শব্দ মুখস্থ করলেই হবে না, নিয়মিত শুদ্ধ ইংরেজি লেখা ও পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশ্লেষণী দক্ষতা একটু ভিন্ন—এটি একাডেমিক পাঠ্যসূচিতে সাধারণত থাকে না, তবে যুক্তি, মনোযোগ ও ধৈর্য দিয়ে বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষমতা এখানে যাচাই করা হয়। প্রথম দিকে কঠিন লাগলেও পরে এই প্রশ্নগুলো সমাধানে বেশ মজা পাওয়া যায় এবং একই সমস্যাকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখার অভ্যাস তৈরি হয়।
আমার নিজের প্রস্তুতির কথা বলি—আমি কোনো ব্যক্তিগত শিক্ষক রাখিনি, তবে দিকনির্দেশনার জন্য একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম। এরপর প্রচুর প্রশ্নব্যাংক সমাধান করে পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাপনা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছি। আইবিএর প্রশ্নের পাশাপাশি জিআরই, জিম্যাট এবং টোয়েফলের বই থেকেও অনুশীলন করেছি। বাইরের বই পড়ে শব্দভান্ডার বাড়িয়েছি। আমি বেশ আলসে, তাই টেবিলে বসে নিয়মিত পড়তাম না; বরং শুয়ে শুয়েই গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতাম। এই আলস্যই আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠে—মাথায় দ্রুত হিসাব করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা মূলত দক্ষতা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম। দিনে ১০ ঘণ্টা পড়তেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, বরং নিয়মিত অনুশীলন, নিজের দুর্বলতা চেনা এবং নির্ধারিত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাটি ১২০ মিনিটের; ৯০ মিনিটের বহুনির্বাচনী অংশ এবং ৩০ মিনিটের লিখিত অংশ—দুটোই মাথা ঠান্ডা রেখে সামলাতে হয়।
প্রস্তুতির জন্য তিনটি বিশেষ টিপস: প্রথমত, ৯০ মিনিটের বহুনির্বাচনী অংশে লক্ষ্য রাখুন তিনটি বিষয়েই নিরাপদ অবস্থানে থাকা, এরপর যে অংশে সবচেয়ে ভালো, সেখানে নম্বর বাড়ানোর চেষ্টা করুন। দ্বিতীয়ত, নিজের কাছে মিথ্যা বলবেন না—কোন বিষয়ে আপনি ভালো, কোনটিতে দুর্বল, তা যত দ্রুত চিনবেন, প্রস্তুতিও তত কার্যকর হবে। তৃতীয়ত, প্রশ্নব্যাংকের চেয়ে একটু কঠিন প্রশ্ন সমাধান করুন, তাহলে পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র তুলনামূলক সহজ মনে হবে। আর যেহেতু এটি দক্ষতা ও যুক্তি যাচাইয়ের পরীক্ষা, তাই পাঠ্যবইয়ের বাইরে আর্টিকেল পড়া, বই পড়া বা ভালো সিনেমা দেখাও আপনার চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
আইবিএ আমার জীবনের অন্যতম সেরা সময়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কঠিন হলেও সেই ১২০ আসনের একটিতে জায়গা করে নেওয়ার পর বুঝতে পারবেন, এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নয়—বাকি জীবনের গল্পই নতুন করে লেখা শুরু হয়। বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র আইবিএ রয়েছে। এ ছাড়া আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিলেট ও সাভারে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।




