শিক্ষা, গবেষণা, খেলাধুলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড—সবক্ষেত্রেই সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার জপসা গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদ শরীফ। এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তরুণ এবার উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। গত ৮ আগস্ট তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান এবং ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার রসায়ন বিভাগে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি শুরু করতে যাচ্ছেন। এই বৃত্তির আওতায় তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি উপবৃত্তি এবং স্বাস্থ্যবিমার সুবিধাও পাবেন। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকেও সুযোগ পেলেও নিজস্ব পছন্দের বিষয়বস্তুর কথা মাথায় রেখে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বেছে নেন।

শরীফের শিক্ষাজীবনের শুরু হয় পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও শরীয়তপুর সরকারি কলেজ থেকে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক পর্যায়ে ৩.৭৮ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৮ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই গবেষণার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। এই আগ্রহ থেকে তিনি ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডি সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে এর সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সেমিনারের আয়োজন করে অন্য শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

গবেষণার ক্ষেত্রে শরীফ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ন্যানোটেকনোলজি, রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যান্ড ক্যাটালিটিক ল্যাবরেটরিতে গবেষণা সহকারী হিসেবে জিংক অক্সাইডের ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় ভিজিটিং রিসার্চার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তাঁর গবেষণালব্ধ কাজ ‘জার্নাল অব পাওয়ার সোর্সেস’, ‘এনার্জি স্টোরেজ ম্যাটেরিয়ালস’ এবং ‘জার্নাল অব এনার্জি স্টোরেজ’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি চট্টগ্রাম গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসব ২০২৫-এ ‘হাইয়েস্ট ইমপ্যাক্ট পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড’ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফেলোশিপ লাভ করেন। পাশাপাশি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ভ্রমণ অনুদানও পান তিনি।

একাডেমিক সাফল্যের বাইরেও শরীফের জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’র স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ‘টেডেক্স চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ইভেন্ট পরিচালক, সাইক্লিস্টস এবং টোস্টমাস্টার্স ক্লাবের সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। নেতৃত্বদানের অভিজ্ঞতায় তিনি শরীয়তপুর জেলা ছাত্র সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর অবদান হিসেবে ‘ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল অ্যান্ড গ্রিনার আর্থ’ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

শারীরিক সক্ষমতা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় তাঁর দল ‘ট্রেফয়েল-৫৪’ চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দুঃসাহসিক অভিযানের নেশায় ২০২২ সালে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল রাইড সম্পন্ন করেন। বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সময় স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস, এটি কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং নিজেকে আবিষ্কার এবং অন্যের জন্য সুযোগ তৈরি করার একটি প্ল্যাটফর্ম।