সড়ক দুর্ঘটনার শোকাবহ চিত্র আবারও সামনে এলো। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে সারাদেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন। জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে দৈনিক গড় প্রাণহানি ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যুর ধারাবাহিকতায় এবারও থামছে না মৃত্যুর মিছিল।
দুর্ঘটনার ভৌগোলিক বিচারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা বিভাগ। আগস্ট মাসে ঢাকা বিভাগে ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ঢাকা শহরের ভেতরে ৪৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৩ জন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, আঞ্চলিক সড়কে ২১৭টি এবং জাতীয় মহাসড়কে ১৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। শহরের তুলনায় আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে গতি বেশি থাকে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত লেন বিভাজক নেই বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখন সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গত বছরও ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এ ছাড়া বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মতো ভারী যানবাহনের সঙ্গে স্বল্পগতির ভ্যান, রিকশা বা থ্রি-হুইলারের একই লেনে চলাচল ‘মিক্সড ট্রাফিক ফ্লো’ তৈরি করছে, যা সংঘর্ষবিন্দু বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১২৬টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৯৫টি যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারানো, ৭৮টি পেছন থেকে ধাক্কা এবং ১০৬টি পথচারী চাপা পড়ার ঘটনা ঘটেছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী সুজন শর্মা বলেছেন, দ্বিমুখী সড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষের অন্যতম কারণ অপর্যাপ্ত ওভারটেকিং সাইট ডিসট্যান্স। নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা সড়কের বাঁকগুলোতে সুপারএলিভেশনের অভাব প্রমাণ করে। দুর্বল পেভমেন্ট ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে ব্রেকিং কার্যকারিতাও কমে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকের শাস্তি নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস রোড নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ থ্রি-হুইলারের বদলে ইলেকট্রিক বাস চালু, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞানসম্মত নকশা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া মৃত্যুর এই মিছিল থামানো সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন সুজন শর্মা। উল্লেখ্য, তিনি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী।




