তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে বড় ধস নামায় সরকার এখন নতুন উৎসের সন্ধানে নেমেছে। চারটি দেশের সাথে আটটি চুক্তি থাকলেও চলতি বছরে নির্ধারিত ১০৩টি কার্গোর মধ্যে প্রথম নয় মাসে মাত্র ২১টি এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে চুক্তির বেশিরভাগ চালান বাতিল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে উচ্চ মূল্যে কিনতে হয়েছে। ফলে সরবরাহ ধরে রাখতে এলএনজির উৎস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রে জানা যায়, গত বছর এলএনজির ৭০ শতাংশই এসেছিল কাতার থেকে। এ বছর আরও বেশি আমদানির আশা থাকলেও মার্চে কাতারের বৃহত্তম এলএনজি ইউনিটে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সরবরাহ ক্রমাগত কমছে। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ এখন আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হয়। কাতার ও ওমানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চারটি এবং ওমানের সাথে একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি আছে। এছাড়া মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সাথে দীর্ঘমেয়াদি ও সৌদি আরামকোর সাথে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। সবশেষ বর্তমান সরকারের আমলে আমেরিকার গানভর কোম্পানির সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়েছে, যার সরবরাহ চলতি সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর মোট ১০৯টি কার্গো আনা হয়েছিল। এবার ১১৫টি কার্গো আনার লক্ষ্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে ৮৬টির মধ্যে আগস্ট পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১৩টি। স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ১৭টির মধ্যে এসেছে চারটি। চুক্তির বাইরে দরপত্রের মাধ্যমে ১২টি কেনার পরিকল্পনা থাকলেও সরবরাহ কম থাকায় ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬টি কার্গো খোলাবাজার থেকে কিনতে হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ইউনিটে এখন ২৮ ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে।
বিশ্বের ২৪টি দেশ এলএনজি রপ্তানি করলেও মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর ৭৬ শতাংশ নির্ভরতা। কাতার দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হলেও যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন প্রায় বন্ধ। কাতার এনার্জি নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প খুঁজছেন। দীর্ঘমেয়াদি পাঁচটি চুক্তির আওতায় নভেম্বর পর্যন্ত ৪৭টি কার্গো বাতিল হয়েছে। এসব কার্গো এখন খোলাবাজার থেকে কিনতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরবরাহের উৎস বহুমুখী করাই মূল লক্ষ্য। মালয়েশিয়া, মিয়ানমার এবং কাতারের সাথে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গানভর কোম্পানির সাথে নতুন চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭ কার্গো কেনা হবে। এ বছরের বাকি সময়ে পাঁচটি কার্গো আসার কথা, যার মধ্যে দুটি এ মাসেই আসবে।
মালয়েশিয়া থেকে দুই বছরের স্বল্পমেয়াদি চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছে। এতে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও চাহিদা ও দাম বুঝে আমদানি করা যাবে। মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনার পরিকল্পনা থাকলেও সীমান্ত সংঘাতের কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এলএনজি করে আনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া থেকে সরাসরি আমদানি না করলেও কিছু কোম্পানি অস্ট্রেলিয়া থেকে সরবরাহ করে। অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়া থেকেও এলএনজি আসছে। এছাড়া কম দামে কেনার জন্য সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি (ডিপিএম) ব্যবহার করে ২০২৬ সালের জন্য হংকংয়ের ঝেনইউ শিপিং, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, চীনের চায়না রানজে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডারাব ইনকরপোরেটেড থেকে আট কার্গো কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গত মাসে চারটি কার্গো আসার কথা থাকলেও একটিও আসেনি।
মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা বছরে ১১৫ কার্গো। আগামী বছর চুক্তিভিত্তিক ১১৬ কার্গো আসার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এ অবস্থায় খোলাবাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হতে পারে। পেট্রোবাংলা প্রতি মাসে গড়ে ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে। যুদ্ধের সাত মাসে (মার্চ-সেপ্টেম্বর) অতিরিক্ত লোকসান হয়েছে ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সরকারের কাছে ভর্তুকি হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বৃহস্পতিবার সরবরাহ হয়েছে ২৩২ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ সরবরাহ সক্ষমতা ১০৫ কোটি ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তাই ঝুঁকিও বেশি। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও চীন থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। কাতারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এখন গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে। বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।




