সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত পরমাণু বিজ্ঞানের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ' বা সার্নে-তে ইন্টার্নশিপ করার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহিম ইসলাম। ইন্টারনেটের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন হিসেবে সুযোগ পাওয়া মাহিমের জন্য ছিল এক স্বপ্নপূরণের যাত্রা। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম এবং তাঁর সম্মানে নামা 'বোসন' কণা সম্পর্কে জানার পর থেকেই মাহিমের মনে সার্ন এবং লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নিয়ে প্রবল কৌতূহল জন্মেছিল।

মাহিমের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল সিনিয়রদের উৎসাহে এবং সার্নের সামার স্টুডেন্ট প্রোগ্রামে আবেদনের মাধ্যমে। তবে আবেদন প্রক্রিয়াটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তিনি জানান, তাঁর সিজিপিএ খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না এবং কোনো অধ্যাপকের সুপারিশপত্র জোগাড় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ল্যাব ইনস্ট্রাক্টরের একটি সুপারিশপত্র এবং নিজের আগ্রহ থেকে করা কিছু ব্যক্তিগত প্রজেক্টের ওপর ভরস করে আবেদন জমা দেন তিনি। ফলাফল প্রকাশের দিন ২৯ এপ্রিল জানতে পারেন যে, ৯০টিরও বেশি দেশ থেকে ২১ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ৩২২ জনের একজন হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সার্নের সদস্য রাষ্ট্র না হওয়া সত্ত্বেও তিনি একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এই সুযোগ পান।

পুরো যাত্রার খরচ, ভাতা এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করে সার্ন। ফ্রান্সের সাঁ-জেনি এলাকায় বসবাস করে প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্ন ক্যাম্পাসে অফিস করতে যে রোমাঞ্চ, তা মাহিমের কাছে ছিল অত্যন্ত মজাদার। সেখানে তিনি 'অ্যালিস' (এ লার্জ আয়ন কোলাইডার এক্সপেরিমেন্ট) কম্পিউটিং গ্রিড নিয়ে কাজ করেন। নরওয়ে ও রোমানিয়ার দুই সুপারভাইজারের অধীনে তাঁর মূল কাজ ছিল অ্যালিসের সফটওয়্যারকে এমন এক নতুন প্রসেসরে চালানোর উপযোগী করা, যা বিদ্যুৎ খরচ কমাবে এবং ভবিষ্যতে বড় কম্পিউটিং অবকাঠামোর ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়, আর সেই বিশাল প্রক্রিয়ারই একটি অংশ ছিল মাহিমের দায়িত্ব।

কাজের পাশাপাশি মাহিম সরাসরি দেখেছেন বইয়ে পড়া অ্যালিস ডিটেক্টরের বিশালতা এবং লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত নোবেল পদক। এমনকি সি++ ভাষার জনক বিয়ারনে স্ট্রোস্ট্রুপের বক্তৃতা শোনার সুযোগও তাঁর হয়েছে। সার্নের গবেষণার সংস্কৃতিতে প্রশ্ন করার যে স্বাধীনতা এবং কেউ কিছু না জানলে তা অকপটে স্বীকার করে নেওয়ার যে আত্মবিশ্বাস, তা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

ছুটির দিনগুলোতে তিনি ফ্রান্স, ইতালি এবং সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেছেন। একই সঙ্গে বিদেশি সহকর্মীদের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ভাষা আন্দোলনের কথা তুলে ধরেছেন, যা অনেকের কাছেই ছিল নতুন এবং বিস্ময়কর।

সবশেষে মাহিম মনে করেন, সার্নে যাওয়াটা কেবল একটি অর্জন নয়, বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। তিনি বিশ্বাস করেন, যোগ্যতার সবটুকু কেবল ট্রান্সক্রিপ্ট বা সিজিপিএ-র পাতায় লেখা থাকে না। তাই জুনিয়র শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা—ফলাফল খারাপ হলেও আগ্রহের জায়গা থেকে নিজে কিছু শেখার ও বানানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সুযোগ এলে আবেদন করতে হবে। কারণ, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও ছোট প্রজেক্টের মাধ্যমেই অনেক সময় বড় সাফল্যের দরজা খুলে যায়।