নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর কার্যালয় থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে বাহাম গ্রামে অবস্থিত রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি বর্তমানে এক অচলায়তনে পরিণত হয়েছে। সোয়া দুই একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই বিশাল স্থাপনাটি গত দুই বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে এবং এর প্রধান ফটক অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ থাকে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগ এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয় প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে ৫ কোটি এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে আরও ১০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়; সব মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়ায় ৫০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ১১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও এর স্থায়িত্ব ছিল স্বল্পমেয়াদী। মূল পরিকল্পনায় এখানে রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে উৎসব আয়োজনের কথা থাকলেও উদ্বোধনের পর মাত্র এক বছর কিছু সীমিত অনুষ্ঠান হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রটিতে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, কম্পিউটার, মনিটর, আইপিএস, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, আসবাবপত্র, চেয়ার-টেবিলের পাশাপাশি অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্স ও বজ্রনিরোধক যন্ত্রসহ মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়। যদিও স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় কিছু জিনিস উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে কেন্দ্রের বর্তমান দশা অত্যন্ত করুণ। দীর্ঘদিনের অযত্নে হাঁটার পথ ও খোলা প্রাঙ্গণ ঘাস-লতাপাতায় ঢেকে গেছে। ভবনের গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদ ভেঙে পড়েছে এবং লিফটের পাশাপাশি অনেক এসি ও লাইট অকেজো হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রটির প্রশাসনিক ব্যর্থতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে এর পরিচালনা কমিটির ক্ষেত্রে। ২১ সদস্যের একটি কমিটি থাকা সত্ত্বেও গত তিন বছরে একটি সভাও ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির একজন সদস্য। জনবলসংকটেও চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে; ৩৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র দুজন কর্মী—একজন টেকনিশিয়ান এবং একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কর্মরত আছেন। বর্তমানে টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামানই কেন্দ্রটির সার্বিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। মাসে বেতন ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু কোনো সাংস্কৃতিক প্রাণস্পন্দন সেখানে নেই।

নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীগ্রন্থের প্রণেতা সঞ্জয় সরকার উভয়েই কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, কেবল ভবন বা জাদুঘর দিয়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সচল হয় না, বরং শিল্পী ও দর্শনার্থীদের আনাগোনায় এটি প্রাণ পায়। অন্যদিকে, নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটিকে কীভাবে পুনরায় কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা চলছে। উল্লেখ্য, শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, যাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'গীতাম্বুধি' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।