রাজনৈতিক বন্দীদের সন্তানদের চোখে ২৫ বছর আগের সেই স্মৃতি আজও যেন তাজা ক্ষত। ২০০১ সালের ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর ইরিত্রিয়ার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যখন রাষ্ট্রপতি ইসাইয়াস আফওয়ারকির বিরুদ্ধে সংবিধান বাস্তবায়ন ও নির্বাচনের দাবিতে প্রকাশ্য চিঠি দেওয়া ১৫ জন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দেশটির স্বাধীনতাযুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা পেত্রোস সলোমন। তাঁর মেয়ে হান্না পেত্রোস সলোমন বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সেই দিনগুলোতে তাঁরা কার্যত এতিম হয়ে গিয়েছিলেন।
হান্নার বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। বাবার শেষ দেখা পাওয়ার কথা মনে করে তিনি বলেন, "কাঁধে তোয়ালে রেখে তিনি খেলাধুলার পোশাকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।" পেত্রোস সলোমন ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শেষে মৎস্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির কাছে খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তিনি এবং অন্য ১৪ জন — এই দলটি G-১৫ নামে পরিচিত। ওই চিঠিতে সংবিধান কার্যকর ও নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ইসাইয়াস এই সমালোচনা মোটেও সহ্য করেননি।
হান্না জানান, ৯/১১-এর কয়েকদিন পর বিশ্ব যখন আল-কায়দার হামলায় ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ই গোপন অভিযানে তাদের বাড়ি থেকে বাবাকে তুলে নেওয়া হয়। ট্র্যাকসুট পরে বের হওয়ায় পথেই তাঁকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী। মা তখন উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। এরপর একদিন ক্লাসমেটরা তাকে জানায়, "তোমার বাবা দেশের বিশ্বাসঘাতক।" হান্নার কাছে সেই মুহূর্তটাই ছিল সবচেয়ে আঘাতের।
দুই বছর পর মা অ্যাস্টার ইয়োহানেস যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সরকারি আশ্বাসে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর কিছু হবে না। কিন্তু ২০০৩ সালের ১১ ডিসেম্বর আসমারার বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ পরিবারের সামনে তিনি আর দেখা দেননি। পরে জানা যায়, তাঁকে কার্শেলি কারাগারে আটক করা হয়েছে। বাবার অবস্থানও অজানা — ধারণা করা হয়, পূর্বাঞ্চলের নির্জন ও অত্যন্ত গোপন এল-এরো কারাগারে তাঁকে রাখা হয়েছে। বিচার বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগই তাঁদের দেওয়া হয়নি।
একই অবস্থা ইব্রাহিম শেরিফোর পরিবারেও। তাঁর বাবা মাহমুদ আহমেদ শেরিফো ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও ডি ফ্যাক্টো উপ-রাষ্ট্রপতি। মা অ্যাস্টার ফিসেহাটসিয়নও ছিলেন শাসক দলের সিনিয়র সদস্য। ২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে নিরাপত্তা বাহিনী ঘরে ঢুকে পায়জামা পরা অবস্থায় মাকে নিয়ে যায়। বাবার বাড়িতে গিয়ে ইব্রাহিম জানতে পারেন, বাবাকেও আটক করা হয়েছে।
এখন ৩৮ বছর বয়সী ইব্রাহিম নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় নিয়ে রাজনীতি বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। তিনি বলেন, "২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আমার জন্য অন্ধকার দিন — শুধু আমার জন্য নয়, গোটা ইরিত্রিয়ার জনগণের জন্য। কারণ এদিনই আইন ও গণতন্ত্রকে আটক করা হয়েছিল।"
ইরিত্রিয়া সরকার বা যুক্তরাজ্যে অবস্থিত তাদের দূতাবাস — কেউই বিবিসির জিজ্ঞাসার জবাব দেয়নি। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ G-১৫ সদস্যদের মত প্রকাশের বন্দি হিসেবে বিবেচনা করে তাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। ৮০ বছর বয়সী রাষ্ট্রপতি ইসাইয়াস এখনও ১৯৯৭ সালে অনুমোদিত সংবিধান কার্যকর করেননি এবং কোনো নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় রয়েছেন।
হান্না এখন ৩৫ বছর বয়সী, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। নিজের শোককে তিনি গভীর সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন — কখনো শান্ত, কখনো ঢেউয়ের মতো আঘাত করে। তিনি বলেন, "মাঝে মাঝে মনে হয় হাঁপিয়ে উঠছি।" বাবা-মাকে কোনো বার্তা পাঠাতে পারলে তিনি বলবেন, "আমাদের নিয়ে চিন্তা করবেন না। যেমনটা আপনারা সংগ্রামে টিকে ছিলেন, আশা করি এই কঠিন সময়ও পার হয়ে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসবেন।"
ইব্রাহিম ও হান্না দুজনেই কৃতজ্ঞ সেই আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি, যারা ঝুঁকি নিয়ে তাদের দেখাশোনা করেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, তাদের বাবা-মায়ের চাওয়া ছিল সঠিক — সংবিধান ও নির্বাচন। "তাদের বিবেক ছিল, আর ইসাইয়াস ও তার গোষ্ঠী যা করেছে তা দেখে চুপ করে থাকতে পারেননি," বলেছেন ইব্রাহিম। তিনি আরও বলেন, "বাবা-মা বেঁচে আছেন কি না — এটা জানা আমাদের পরিবারের অধিকার।"




