ইউক্রেনের পশ্চিমঞ্চলীয় ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক অঞ্চলের বুকোভেল স্কি রিসোর্টে প্রথমবারের মতো 'কার্পাথিয়ান এইট' (Carpathian Eight) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সভাপতিত্বে এই বৈঠকে ইউক্রেন ছাড়াও রোমানিয়া, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এই সম্মেলনে। জেলেনস্কি টেলিগ্রামে এই সম্মেলনকে একটি 'তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, এর লক্ষ্য দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং ইইউ স্তরে সহযোগিতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা। নিরাপত্তা, জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহায়তার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে এই সম্মেলনের আবহে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার 'হাইব্রিড হুমকি' নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, যেসব ইউরোপীয় দেশ কিয়েভকে সমর্থন করছে, বিশেষ করে পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ড্রোন বা রকেটের মাধ্যমে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে মস্কো। সম্প্রতি পোল্যান্ড, জার্মানি এবং ডেনমার্কের কর্মকর্তারা ড্রোন অনুপ্রবেশ, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ এবং প্রতিরক্ষা স্থাপনার ওপর নজরদারির জন্য রাশিয়াকে অভিযুক্ত করেছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন মনে করেন, রাশিয়ার এই ধরনের হাইব্রিড আক্রমণের মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ন্যাটোর মতো একটি শক্তিশালী মেকানিজম থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমের অভিযোগগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন যে, রাশিয়ার কোনো আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা নেই এবং পশ্চিমা দেশগুলো কেবল তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর অজুহাত খুঁজছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, যদি পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে মস্কো কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। তিনি এই ধরনের পদক্ষেপকে 'জলদস্যুতা' হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রাশিয়া যেকোনো এলাকা বেছে নিতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়া একটি বিশাল 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া নৌবহর ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হয়, যার ফলে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য বেশ কিছু ট্যাঙ্কার আটক করেছে।

এদিকে, যুক্তরাজ্য কর্তৃক ইউক্রেনকে ড্রোন ও অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ব্রিটিশ চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স-কে তলব করেছে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইউক্রেনের অভ্যন্তরে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলো রাশিয়ার জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বিপরীতে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে যে ইউক্রেনের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।

আর্থিক সহায়তার বিষয়ে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ইউক্রেন ৩.৩ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার) সহায়তা পেয়েছে, যা মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কেনার মতো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হবে। এই অর্থ সাহায্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চলতি বছর ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতি প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এরই মাঝে যুদ্ধের ভয়াবহতা অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের ঝিতোমির ও খারকিভ অঞ্চলে রুশ হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত এবং অনেকে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৪টি অঞ্চল ও ক্রিমিয়াতে ৬২৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে। এছাড়া ইউক্রেনের বন্দর ও লজিস্টিক সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। পাল্টা হিসেবে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার কুরস্ক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি কুলিং টাওয়ারে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে রুশ পরমাণু সংস্থা রোসাটম, তবে এতে কোনো বিকিরণ ঝুঁকি তৈরি হয়নি।