ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের একটি মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মূলত শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানোই এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় বয়স অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিক বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। অন্যদিকে, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের জন্য বিশেষ 'মিনি অ্যাকাউন্ট' তৈরির সুযোগ থাকবে, যা অভিভাবক বা আইনি অভিভাবকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই বিশেষ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তারা দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারবেন। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরাই কেবল স্বাধীনভাবে নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি পাবেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেয়েন এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন 'ইইউ কিডস অ্যাক্ট'। তিনি জানান, এই আইনের লক্ষ্য হলো অভিভাবকদের পুনরায় সন্তানদের ডিজিটাল জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং শিশুদের একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশে বড় হতে সাহায্য করা। তার মতে, অনেক শিশু এমন এক অনলাইন জগতের সম্মুখীন হচ্ছে যার জন্য তারা প্রস্তুত নয়; যেখানে সাইবার বুলিং বা ছোটবেলার ভুলগুলো স্থায়ীভাবে রেকর্ড হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই বিধিনিষেধ কেবল ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো জনপ্রিয় অ্যাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইউটিউবের মতো ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গেম এবং এআই চ্যাটবটগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো গঠনগতভাবেই নিরাপদ। ব্যর্থ হলে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক বিক্রয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। এছাড়া, কোম্পানিগুলোকে বিস্তারিত শিশু নিরাপত্তা পরিকল্পনা জমা দিতে হবে এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য কোনো আসক্তিকর বা ক্ষতিকর ফিচার রাখা যাবে না।

যদিও ফ্রান্স এবং স্পেনের মতো কিছু দেশ ইতিমধ্যে নিজস্ব বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে, তবে এই ইইউ-ব্যাপী আইনটি কার্যকর হলে তা জাতীয় আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি বাধ্যতামূলক হবে। তবে এই আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করলেও দেশটির শীর্ষ আদালত একে 'বাক-স্বাধীনতা'র পরিপন্থী বলে আটকে দিয়েছিল। এছাড়া বয়স যাচাইকরণের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও সমালোচকদের উদ্বেগ রয়েছে। 이에 대해 কমিশন জানিয়েছে, তারা ইইউ-এর বিদ্যমান বয়স যাচাইকরণ অ্যাপ ব্যবহার করবে এবং কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা শেয়ার করা হবে না।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় কমিশন এই প্রস্তাবনা তৈরির ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেছে, যারা গত বছর ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ায় এই আইন কার্যকর করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যও আগামী বছরের বসন্তকালে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে। ইইউ-এর এই প্রস্তাবটি এখন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।