রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাসাকাওয়া মিলনায়তনে সোমবার অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক একটি সেমিনার। আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ আয়োজনে গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে এ অনুষ্ঠানে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপিত হয়। আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জরিপ ও স্বাস্থ্য মূল্যায়নের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামে পানির উৎস নিয়ে জরিপ চালানো হয়। মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি উৎস পরীক্ষা করা হয়; এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি, অর্থাৎ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে লবণাক্ততার হার কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ পাওয়া গেছে—যা উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকটের তীব্রতা নির্দেশ করে।
একই গবেষণার আরেক অংশে দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, আগামী ১০ বছরে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যক্তির মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার রোগ—অর্থাৎ হৃদ্রোগ কিংবা স্ট্রোকে—আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণে কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানান, পানির লবণাক্ততা ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
সেমিনারে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস উল্লেখ করেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারিত নেই। পানিতে সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা করে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন। অপরদিকে, একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলের পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময় লবণাক্ত থাকতে পারে। এ কারণে দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার, পাশাপাশি উপকূলীয় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উঁচু করার ওপর জোর দেন তিনি।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ এখনো সীমিত; তবে উপকূলে স্বাস্থ্য সমস্যা যে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, তা এই গবেষণায় স্পষ্ট। তিনি জানান, গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি ফিল্টার (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার), টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন ও নজরদারিব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গবেষক আলিয়া নাহিদ প্রথম আলোকে জানান, এ গবেষণা ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তা শেষ হওয়ার কথা। উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হৃদ্রোগের ঝুঁকির উচ্চ হার—এই দুটি বিষয় গবেষণায় উঠে এলেও, পানির সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এটি মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের বৃদ্ধি এখন একটি বড় সমস্যা; এসব ঝুঁকি কমাতে সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আলোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উপকূলের বাস্তবতা সামলাতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে; কখনো বিষয়টিকে কেবল স্বাস্থ্য, কখনো পরিবেশ বা জলবায়ুর সমস্যা হিসেবে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়—যা পরিস্থিতির উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
সেমিনারে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে অসংক্রামক রোগপ্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহিন, এক্সপ্যান্ডিং অ্যাকসেস টু ইন্টিগ্রেটেড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সুশান্ত রায় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী অংশ নেন। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।




