কোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে হঠাৎ পেটের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠা কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলার সময় অস্বস্তি অনুভব করা—এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। পরীক্ষার আগের রাতে বারবার বাথরুমে যাওয়া বা খারাপ খবর শোনার পর পেট অস্থির হয়ে ওঠাও কম দেখা যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এসবের পেছনে শুধু মনস্তাত্ত্বিক কারণই নয়, বরং শরীরের ভেতরে তখন মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে একটি সক্রিয় যোগাযোগ চলছে।

মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের এই সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও স্নায়ুবিজ্ঞানী ডা. এমেরান মেয়ার। তাঁর 'দ্য মাইন্ড-গাট কানেকশন' বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, অন্ত্রে রয়েছে একটি বিশাল স্নায়ুতন্ত্র, যার নাম এন্টেরিক নার্ভাস সিস্টেম। এই স্নায়ুতন্ত্র পরিপাকতন্ত্রের নানা কাজ নিয়ন্ত্রণ করে বলে একে অনেক সময় 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক'ও বলা হয়। অর্থাৎ পেট শুধু খাবার হজমের কারখানা নয়—অন্ত্রের নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র সারাক্ষণ শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন অনুধাবন করে এবং যথাযথ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

অনেকে মনে করেন, মস্তিষ্কই একমাত্র নিয়ন্ত্রক—সে নির্দেশ দেবে, আর শরীর তা মেনে চলবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল। মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান সেতু হলো ভেগাস নার্ভ। এই স্নায়ুপথের মাধ্যমে অন্ত্রের অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে আমরা কী খাচ্ছি, অন্ত্রে কী পরিবর্তন হচ্ছে—সবকিছুর প্রভাব মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও পড়ে। ভয়, উদ্বেগ বা উত্তেজনার সময় পেটে অস্বস্তি হওয়ার কারণ এটিই। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও পরিপাকতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম। আমাদের অন্ত্রে কোটি কোটি অণুজীব বাস করে, যা পরিপাক, বিপাক এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। আবার অন্ত্রের পরিবর্তনও মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়—মানসিক চাপ বাড়লে ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস এলোমেলো হয়, অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়। তবে উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার একমাত্র কারণ অন্ত্রের সমস্যা নয়—এতে জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক নানা উপাদান কাজ করে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই যোগাযোগ ব্যবস্থার যত্ন কীভাবে নেওয়া যায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না, পুরো জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধীরে খাওয়ার অভ্যাস উপকারী। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্যসহ আঁশযুক্ত খাবার রাখা যেতে পারে। উপকারী অণুজীব বা প্রিবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবারও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পরিহার করা প্রয়োজন।

তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। অনলাইনে অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে নানা পরামর্শ ছড়িয়ে থাকলেও সেগুলো অন্ধভাবে অনুসরণ করা ঠিক নয়। একজনের জন্য ভালো খাবার অন্যের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ শারীরিক সমস্যা, নিয়মিত ওষুধ সেবন বা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা থাকলে নিজে নিজে সাপ্লিমেন্ট বা কঠোর ডায়েট শুরু না করাই ভালো। ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, শারীরিক অবস্থা ও ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের সম্পর্ক বোঝা গেলে শরীরের অনেক সংকেত স্পষ্ট হয়। দুশ্চিন্তায় পেট মোচড় দিতে পারে, আবার দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যাও মনকে ভারাক্রান্ত করতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে শুধু প্লেটের খাবার নয়, ঘুম, মানসিক চাপ, দৈনন্দিন অভ্যাস—সবকিছুর প্রতি সমান নজর দেওয়া জরুরি। মন ও পেটকে আলাদা না ভেবে শরীরের একই যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে বলছেন গবেষকেরা। প্রয়োজন হলে একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।